শনিবার,  ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,  ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,  রাত ৯:২৬

ইদিলপুরে ‘অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান’ প্রকল্প মানেই শুভঙ্করের ফাঁকি!

এপ্রিল ২২, ২০১৮ , ২১:০৪

আবদুল বারেক ভূইয়া
শরীয়তপুর জেলার ইদিলপুর ইউনিয়নে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ‘অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান’ কর্মসূচি প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ৭টি প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

ইদিলপুর ইউনিয়নে ‘অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান’ কর্মসূচি প্রকল্পের কাজ মানেই শুভঙ্করের ফাঁকি। ফলে সরকার যে উদ্দেশ্য নিয়ে এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সে উদ্দেশ্য বিফলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সরকার মুলত গ্রামের অতিদরিদ্র কর্মবিমুখ বেকার যুবকদের কাজে ব্যাস্ত রাখার পাশাপাশি গ্রামের নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য ২টি পর্যায়ে ৪০ দিন করে ৮০ দিনের কর্মসংস্থান প্রকল্প চালু করেন। আর সে প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজে হচ্ছে ব্যাপক অনিয়ম আর দুর্নীতি।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রকল্পের দরিদ্র শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দ অর্থের ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ অর্থ বিভিন্নভাবে আত্মসাৎ করা হচ্ছে। কর্মহীন অতি দরিদ্র মানুষের কর্ম সংস্থানের মজুরী হিসেবে বরাদ্দকৃত অর্থের একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিদের পকেটে।

গোসাইরহাট উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ৯ এপ্রিল থেকে গোসাইরহাটের ৮টি ইউনিয়নে অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজ শুরু হয়েছে। ৮টি ইউনিয়নে সর্বমোট ২ হাজার ৪শ ৩৯ জন শ্রমিকের বিপরীতে মজুরী হিসেবে ১ কোটি ৯৫ লক্ষ ১২ হাজার টাকা অর্থ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। এর মধ্যে ইদিলপুর ইউনিয়নের ৭টি প্রকল্পে ৪৬৬ জন শ্রমিকের বিপরীতে ৩৭ লক্ষ ২৮ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

১৮এপ্রিল বুধবার সরেজমিনে ইদিলপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন প্রকল্প ঘুরে দেখা যায়, ৭টি প্রকল্পে বরাদ্দকৃত ৪শ ৬৬ জন শ্রমিকের মধ্যে মাত্র ১শ ২২ জন শ্রমিক কাজ করছেন। অর্থাৎ পুরো ইউনিয়নে বরাদ্দকৃত শ্রমিকের প্রায় চার ভাগের তিন ভাগ শ্রমিকই কাজ করছেন না। এই শ্রমিকদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা সরকারী কোষাগারে ফিরত না দিয়ে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিরা হালাল করার পায়তারা করছে।

সরকারি বিধি মোতাবেক প্রত্যেকটি প্রকল্পে যে পরিমাণ শ্রমিক বরাদ্দ রয়েছে তার এক তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ১শত ৫৫ জন নারী শ্রমিক কাজ করার বিধান থাকলেও কোনো প্রকল্পেই কোনো নারী শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি। কোন প্রকল্পেই কোন নাম ফলক বা সাইন বোর্ড লাগানো হয়নি। সেখানে প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে তদারকি করার জন্য গোসাইরহাট উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কোনো প্রতিনিধিকে পাওয়া যায়নি। শুধু তা-ই নয়, ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রকল্পের নামে যেসব শ্রমিক দেখিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে প্রকৃতপক্ষে সেসব শ্রমিক দিয়ে কাজ না করিয়ে অন্য জেলার শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হচ্ছে।

প্রত্যেকটি প্রকল্পের কাজ সরকারি বিধি মোতাবেক সম্পন্ন করার কথা থাকলেও ইউনিয়ন পরিষদের সদস্যরা সেই বিধি বিধানের তোয়াক্কা না করে তাদের ইচ্ছেমত মনগড়া নিয়মে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করছেন। ইদিলপুর ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডের মাছুয়াখালী গ্রামে নুরু ঢালীর বাড়ি হতে তোফাজ্জেল মাদবরের বাড়ি পর্যন্ত একটি মাটির রাস্তার পুণনির্মাণ করা হচ্ছে। এই প্রকল্পের সভাপতি হচ্ছেন ১নং ওয়ার্ড ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ইউনুস ঢালী। এই প্রকল্পে সরকারী ভাবে ৫০জন শ্রমিক বরাদ্দ থাকলেও সেখানে কাজ করছেন মাত্র ১৩জন শ্রমিক। প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার মোস্তফা কামাল বলেন, বুধবার থেকে আজ পর্যন্ত তারা ৮ দিন কাজ করেছেন। প্রতিদিন তিনিসহ ১৩ জন শ্রমিক সকাল ৯টা থেকে বিকাল ৩টা পর্যন্ত কাজ করেন। তাদেরকে দৈনিক মজুরী বাবদ ৩শ টাকা দেয়া হয়।

এই প্রকল্পে ৫০জন শ্রমিকের জন্য ২শ টাকা করে প্রতিদিন ১০হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। তবে স্থানীয় ভাবে শ্রমিকদের মজুরী ৩শ টাকা করে হওয়ায় ১৩ জন শ্রমিক মজুরী নিচ্ছেন ৩হাজার ৯শ টাকা। বাকী ৬ হাজার ১শ টাকা রয়ে যাচ্ছে। এভাবে ৮ দিনে ৪৮ হাজার ৮শ টাকা প্রকল্পে খরচ করা হয়নি। এভাবে ৪০ দিন কাজ করলে ২ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা অব্যবহৃত থেকে যাবে। অর্থাৎ এই প্রকল্পের শ্রমিকদের জন্য ৪০ দিনে বরাদ্দকৃত ৪ লক্ষ টাকার মধ্যে মাত্র দেড় লক্ষ টাকা প্রকল্পে ব্যবহৃত হবে, বাকী আড়াই লক্ষ টাকা প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে না। এই আড়াই লক্ষ টাকা সরকারের কোষাগারে ফিরত যাবে কি না তা এখন দেখার বিষয় হয়ে দাড়িয়েছে।

বাবুল খানের বাড়ি হতে উকিন্দ্র বাড়ৈর বাড়ি পর্যন্ত মাটির রাস্তা পুণনির্মাণ করা হচ্ছে। এই প্রকল্পটিতে ৭৫জন শ্রমিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আর ঐ সকল শ্রমিকের মজুরী হিসেবে ৬ লক্ষ টাকা বরাদ্দ রয়েছে। এই প্রকল্পের সভাপতি হচ্ছেন ১, ২ ও ৩ নং ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য রিজিয়া বেগম। সেখানে গিয়ে শ্রমিক সর্দারসহ ১৮জন শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়। প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার আনসার মাদবরের সাথে আলাপ কালে তিনি বলেন, এই প্রকল্পে আজ ৮ দিন যাবৎ ১৮ জন শ্রমিক কাজ করছে। এই প্রকল্পে ৭৫ জন শ্রমিকের জন্য ২শ টাকা করে প্রতিদিন ১৪ হাজার টাকা বরাদ্দ রয়েছে। তবে স্থানীয় ভাবে শ্রমিকদের মজুরী ৩শ টাকা করে হওয়ায় ১৮ জন শ্রমিক মজুরী নিচ্ছেন ৫হাজার ৪শ টাকা। বাকী ৮ হাজার ৬শ টাকা রয়ে যাচ্ছে। এভাবে ৮ দিনে ৬৮ হাজার ৮শ টাকা প্রকল্পে খরচ করা হয়নি। এভাবে ৪০ দিন কাজ করলে ৩ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা অব্যবহৃত থেকে যাবে। অর্থাৎ এই প্রকল্পের শ্রমিকদের জন্য ৪০ দিনে বরাদ্দকৃত ৬ লক্ষ টাকার মধ্যে মাত্র ২ লক্ষ ১৬ হাজার টাকা প্রকল্পে ব্যবহৃত হবে, বাকী ৩ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা প্রকল্পে ব্যবহার করা হবে না। এই ৩ লক্ষ ৪৪ হাজার টাকা আত্মসাৎ করার পায়তারা চলছে।

কালিখোলা ব্রীজ হতে খোকন পেদার বাড়ি পর্যন্ত মাটির রাস্তাটি পুণনির্মাণ করা হচ্ছে। এই প্রকল্পটির সভাপতি হচ্ছেন সংরক্ষিত ৪, ৫ ও ৬ নং ওয়ার্ডের মহিলা সদস্য উম্মে কুলসুম লাইলী। এই প্রকল্পে ৬৫জন শ্রমিক বরাদ্দ রয়েছে। সরেজমিনে এই প্রকল্পে ১২জন শ্রমিককে পাওয়া যায়। তবে প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার সফিক কবিরাজ বলেন, তারা আজকে ২৪ জন কাজ করছেন। বাকীরা একটু দূরে খাওয়ার জন্য গেছে। এখানেও প্রকল্পের কাজ নিয়ে চলছে তামাশা।

ইদিলপুর ইউনিয়ন পরিষদের ২নং ওয়ার্ড সদস্য ফয়েজ আহাম্মদ একটি প্রকল্পের সভাপতি। এই প্রকল্পে ৯০ জন শ্রমিকের বিপরীতে ৭ লক্ষ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও সরজমিনে গিয়ে ৩০ জন শ্রমিক পাওয়া যায়। প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার নুরুল হক বলেন, দৈনিক ৩শ ৫০ টাকা মজুরীতে ৩০ জন শ্রমিক ৮ দিন ধরে কাজ করছি। ৪নং ওয়ার্ডের মেম্বার হাবিব ঘরামি একটি প্রকল্পের সভাপতি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, তিনি নিজে উপস্থিত থেকে প্রকল্পের কাজ তদারকি করছেন। তবে এই প্রকল্পে ৬০ জন শ্রমিক বরাদ্দ থাকলেও কাজ করছেন মাত্র ১৭ জন। প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার জয়নাল মিয়া জানান, তারা দৈনিক ৩শ ৫০ টাকা মজুরীতে এই প্রকল্পে কাজ করছেন। প্রকল্পের সভাপতি হাবিব ঘরামি বলেন, কয় জন শ্রমিক খাটাইলাম আর কয় টাকা খরচ করলাম, সেটা বড় বিষয় নয়। প্রকল্পের কাজ ঠিকমতো করে দিলেই তো হয়।

ইদিলপুর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নুরুল হক ঘরামি একটি প্রকল্পের সভাপতি। এই প্রকল্পে ৬০ জন শ্রমিকের বিপরীতে ৪ লক্ষ ৮০ হাজার টাকা বরাদ্দ থাকলেও সরেজমিনে গিয়ে ১২ জন শ্রমিক পাওয়া যায়। প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার মোতালেব রাড়ি বলেন, তারা প্রথম দিন থেকেই দৈনিক ৩শ ৫০ টাকা মজুরীতে ১২জন শ্রমিক কাজ করছেন।

৭নং ওয়ার্ড ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য মকফর মোল্যা একটি প্রকল্পের সভাপতি। এই প্রকল্পে ৬৬ জন শ্রমিক বরাদ্দ থাকলেও কাজ করছেন মাত্র ২০ জন। প্রকল্পে কর্মরত শ্রমিকদের সর্দার আবু কালাম জানান, দৈনিক ৩শ ৫০ টাকা মজুরীতে তারা ২০ জন শ্রমিক মকফর মেম্বারের প্রকল্পে কাজ করছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য বলেন, ইচ্ছে করলেই প্রকল্পে বরাদ্দকৃত শ্রমিক ঠিকমতো খাটানো যায় না। পিআইও অফিস, ব্যাংক, ট্যাগ অফিসার, চেয়ারম্যান, মেম্বারসহ ৪০ থেকে ৫০ ভাগ টাকা তাদের পিছনে খরচ আছে। সবকিছু ম্যানেজ করেই আমাদের কাজ করতে হয়।

এ ব্যাপারে ইদিলপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান দেলোয়ার শিকারীর সাথে আলাপ কালে তিনি বলেন, শ্রমিকের সংকট রয়েছে। তাই প্রকল্পগুলোতে কম শ্রমিক খাটানো হচ্ছে। তবে কাজ না করা শ্রমিকদের হাজিরা কেন দেয়া হচ্ছে এবং তাদের উপস্থিত দেখিয়ে কেন বিল জমা দেয়া হবে জানতে চাইলে তিনি ব্যাপারটি এড়িয়ে যান।

গোসাইরহাট উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা তাহমিনা আক্তার চৌধুরীর সাথে আলাপ কালে তিনি বলেন, কয়েকদিন আগে ইদিলপুর ইউনিয়নের প্রকল্প পরিদর্শনে গিয়ে আমিও এ ধরণের অনিয়ম পেয়েছি। বিশেষ করে মহিলা মেম্বার রিজিয়া বেগম বেশ অনিয়ম করেন। প্রতিটি প্রকল্পের সভাপতিদেরকে প্রকল্পের কাজে শ্রমিক বাড়াতে বলেছি। প্রকল্পের কাজ সঠিক ভাবে না করে বিল নেয়ার সুযোগ নেই।

Total View: 1112

    আপনার মন্তব্য





সারাদেশ

কক্সবাজার

কিশোরগঞ্জ

কুড়িগ্রাম

কুমিল্লা

কুষ্টিয়া

খাগড়াছড়ি

খুলনা

গাইবান্ধা

গাজীপুর

গোপালগঞ্জ

চট্টগ্রাম

চাঁদপুর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চুয়াডাঙা

জয়পুরহাট

জামালপুর

ঝালকাঠী

ঝিনাইদহ

টাঙ্গাইল

ঠাকুরগাঁও

ঢাকা

দিনাজপুর

নওগাঁ

নড়াইল

নরসিংদী

নাটোর

নারায়ণগঞ্জ

নীলফামারী

নেত্রকোনা

নোয়াখালী

পঞ্চগড়

পটুয়াখালি

পাবনা

পিরোজপুর

ফরিদপুর

ফেনী

বগুড়া

বরগুনা

বরিশাল

বাগেরহাট

বান্দরবান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ভোলা

ময়মনসিংহ

মাগুরা

মাদারীপুর

মানিকগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জ

মেহেরপুর

মৌলভীবাজার

যশোর

রংপুর

রাঙামাটি

রাজবাড়ী

রাজশাহী

লক্ষ্মীপুর

লালমনিরহাট

শরীয়তপুর

শেরপুর

সাতক্ষীরা

সিরাজগঞ্জ

সিলেট

সুনামগঞ্জ

হবিগঞ্জ

Flag Counter