বৃহস্পতিবার,  ১লা অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,  ১৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,  দুপুর ২:২৫

তনুশ্রীর ঘরে ফেরা

ডিসেম্বর ১৬, ২০১৮ , ২২:৫৪

——ফাতেমা হক মুক্তা।

আমার মা তখন নানাবাড়ি থাকতো আমাদের তিন ভাইবোনকে নিয়ে।
বাবা থাকতেন মালয়েশিয়া।
বাবা ঠিকমতো টাকাপয়সা না দেবার কারণে
মামাদের সংসারে আমরা একরকম বোঝা হয়েই,
দিন যাপন করতাম।
মামা মামীর মধ্যে ঝগড়া লেগেই থাকতো আমাদের নিয়ে।

মা, যে ঘরটাতে আমাদের নিয়ে থাকতেন —
সেই ঘরটা ছিল একদম পুরনো।
বৃষ্টি এলে ঘরের ভিতরে জল পড়তো।
মা, আমাদের কোলের ভিতর নিয়ে এককোণে বসে থাকতেন।
বাবা যখন মালয়েশিয়া যান
আমি তখন সবে স্কুলে যাই।
তন্দ্রার বয়স তিন,
আর তীর্থ মায়ের পেটে।

আমি বাবার চেহারা মনে করতে পারলেও —
তন্দ্রা আর তীর্থ বাবাকে চিনেই না।
লোকমুখে শুনেছি বাবা ওখানে এক ইন্দোনেশিয়ান মেয়েকে বিয়ে করে সংসার করছে।
সে ঘরেও তিন/ চারখানা ছেলেমেয়ে আছে।
বাবা আমাদের মাঝে আর গত পনেরো বছরেও ফিরে আসেনি।
বেশ কয়েকবছর বাবার সাথে আর আমাদের কোনো যোগাযোগও নেই।
মা, বেশিরভাগ সময় চুপচাপ থাকতেন।
মায়ের বিষণ্ণ চেহারা দেখে দেখেই আমি বড় হয়েছি।
বড় হয়েছি মায়ের একজীবন অপূর্ণতা দেখে।
রাতে মা আমাদের ঘুম পাড়িয়ে —
ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করতেন।
আমি কত শত রাত যে ঘুমের বাহানা করে মায়ের কান্নার সাক্ষী হয়েছি —
সে আমার আল্লাহ্‌ জানেন।

আমি তনুশ্রী।
লেখাপড়া করেছি ক্লাস নাইন অব্ধি।
মায়ের গল্পের পাশাপাশি, আমার জীবনের গল্পও শুরু হয়েছিল সেই সময়ই।
মা আর আমি কতইবা ছোটবড় হবো?
পনেরো বা ষোলো —
মায়ের নির্মল সেই দুঃখী মুখটা আজও আমার দৃষ্টিতে লেগে আছে।
দুকানে শুনতে পাই আজও মায়ের সেই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে চাপাকান্নার শব্দ।
মাকে আমি কখনো হাসতে দেখিনি,
বরং, অসংখ্য বার দেখেছি খুব গোপনে অঝোরে কাঁদতে।

আমি যখন ক্লাস ফোরে পড়ি —
তখন আমার জীবনে ঘটে যায় এক ঘটনা।
সেদিন, আমি পাশের বাড়ি স্বপন মামাদের ওখানে টিভি দেখতে গিয়েছিলাম।
আমার পড়া শেষ করে, সন্ধ্যার পর প্রতিদিনই টিভি দেখতে যেতাম।
আশেপাশের অনেকেই দেখতে আসতো।
কারণ, ধারেকাছে আর কারো বাড়িতে তখন টেলিভিশন ছিলনা।

সেদিন ছিল বৃহস্পতিবার।
আমি প্রতিদিনের মতই টিভি দেখতে গিয়েছিলাম স্বপন মামাদের বাড়িতে।
গিয়ে দেখি ঘরে তালা, কেউ নেই —
আমি ফিরে আসছিলাম বাড়িতে।
ফেরার পথে স্বপন মামার সাথে দেখা।
মামা আমাকে দেখে সাইকেল থেকে নেমে পড়লো।
আমি কিছু নাবলে একটু থমকে দাঁড়ালাম।
তারপর, মামা আমাকে বললেন, ফিরে যাচ্ছিস কেন?
টিভি দেখবি না?
চল চল।
ওঠ, সাইকেলে ওঠ।
আজ তোর ইচ্ছামত টেলিভিশন দেখবি।
যতক্ষণ ইচ্ছে দেখবি।
কেউ তোকে বারণ করবেনা।
তোর মামী বাপের বাড়ি গেলো, পরশুদিন ফিরবে।

আমি খুব খুশি হলাম।
স্বপন মামা আমার পাড়াতো মামা।
আমি সাইকেলের সামনে রডে চেপে বসলাম।
আমার শিশুমন ছটফট করছে আনন্দে।
আমি উল্লসিত।
মামা ঘরের তালা খুলে, টেলিভিশন অন করে দিলেন।
একটা নাটক হচ্ছিল।
নাম মনে নেই, আজিজুল হাকিম আর শমী কায়সার
অভিনীত নাটক, সেটা আজও মনে আছে।

মা, আমাকে প্রতিদিনের মতই সেদিন রাতে নিতে এসেছিল।
কিন্তু, স্বপন মামা মায়ের হাতে ১০০ টাকা ধরিয়ে দিয়ে বললেন,
হাফিজা, আজ তনুশ্রী থাক আমার বাড়িতে।
তোর ভাবী নেই, রাতে বড্ড ঘর খালী লাগছে।
ইচ্ছে করলে তুইও থাকতে পারিস।
কি, থাকবি?
মা, বললেন —
ভাইজান, ওরা ঘরে ঘুমাচ্ছে।
আমি থাকি কেমন করে?
তাইলে, তনু থাক।
আপনার হুকুম হাকাম শুনতে পারবে।

মা, আমাকে তনু বলেই ডাকতেন।
তনুশ্রী বাবার রাখা নাম।
বাবা নাকি খুব কলকাতার বাংলা সিনেমা দেখতেন।
তাই এই নাম,
মা বলেছেন।
তন্দ্রা আর তীর্থর নাম আমার ছোট খালা রেখেছিলেন।
খালার বিয়ে হবার পর আমাদের আর তেমন খবর নিতেন না।
তবে, মাকে তার পুরনো কাপড়গুলো পাঠাতেন।

এবার সেই কালো রাতের কথায় আসি।
সেদিনের সেই রাতে আমি মৃত্যু বরণ করি। লাশ হয়ে উঠি এক জীবন্ত।
আমি সেদিন স্বপন মামার ঘরে টেলিভিশন দেখতে থাকি।
কিছুসময় পর মামা আমাকে খাটে উঠে বসতে বলে।
আমিও বসি।
তারপর, সে আমার হাত ধরে টেনে তার পাশে বসিয়ে দেন।
এবং, আমার পিঠে হাত দিয়ে ঘষাঘষি করতে থাকেন।
আমি সেদিন কিছুই বুঝতে পারিনি, কি হতে চলেছে
বা
আমার জীবনচাকা কোনদিকে ঘুরতে যাচ্ছে ।
স্বপন মামা আমাকে তার আরো কাছে টেনে নিতে থাকেন।
একসময় তার দাড়িগোঁফওয়ালা মুখ, আমার শুকনো নরম মুখের চারপাশ বিচরণ করে।
আমি বিরক্ত হতে থাকি —
কিন্তু উপায় কি?
আমি একবার উঠে বললাম,
মামা, আমি আর টিভি দেখবো না — বাড়ি যাবো
মায়ের কাছে যাবো।
মামা আমাকে ধমক দিয়ে বললেন —
চুপ —
চুপ কর। তোর মাকে টাকা দিলাম কি এমনি এমনি?

আমি গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ হয়ে রইলাম।
ততক্ষণে বুঝেছি, খারাপ কিছু একটা হতে চলেছে।
এখন আমার বাঁচার সব রাস্তা বন্ধ।
আমি চিৎকার করে কাঁদতে চেয়েও, সেদিন কাঁদতে পারিনি।
মানুষের প্রতি বিশ্বাস, সম্মান সব চোখের পলকে হারিয়ে ফেললাম।

পরদিন, সকালে মা আমাকে ডাকতে আসেন।
কিন্তু তখন আমি ব্যথায় আর জ্বরে প্রায় অচেতন।
মাকে দেখে খুব কাঁদতে ইচ্ছে করছিল —
কিন্তু সেই শক্তি আমার দেহে অবশিষ্ট ছিলনা।
স্বপন মামা মাকে ডেকে বললেন, তনুর গায়ে জ্বর
একটু পর ডাঃ আসবে।
তুই চিন্তা করিসনা হাফিজা।
ওরে বাড়ি নিয়ে কি চিকিৎসা করতে পারবি? পারবি না?
এই নে কেজি পাঁচেক চাল আছে, আর ৩০০ টাকা।
ঘরে গিয়ে রান্না করে ছেলেমেয়ে নিয়ে খা।

মা হয়ত খুশি হলেন।
কারণ, মায়ের যে এসবের বড্ড অভাব।
মা কি কিছুই বুঝলেন না, নাকি বুঝেও চাল আর টাকার কাছে মেয়েকে বিকিয়ে দিলেন,
জানিনা।
আমি কেবলই সেদিন নির্বাক চিৎকার দিয়ে মাকে বলছিলাম —-
মা, মা গো আমার যে সব শেষ।
মাগো আমার খুব ব্যথা হচ্ছে, মাগো আমি যে জ্বরে পুড়ে যাচ্ছি।
ও মা, মাগো —
তুমি আমাকে একবারও জিজ্ঞেস করলে না আমার জ্বর আসলো কেন?

স্বপন মামা আমাকে রাতেই মানা করে দেয় —
আমি যেন কাওকে কিছু না বলি।
বললে, আমার মাকে আর আমাকে মেরে ফেলবে।
আমি খুব ভয় পেয়ে যাই, আর নিজের মুখ বন্ধ রাখি।
সেই দিনটা আমার পাশেপাশেই ছিল স্বপন মামা।
কিছুসময় পরপর আমার পাশে বসে কেবলই ভয় দিচ্ছিল —
গতরাতের ঘটনা আমি যেন কাউকে না বলি।
আমি কাউকে কিছু না বললে, সে মাকে টাকাপয়সা দিবে,
আর বিনিময়ে —
সে যখন যা বলবে, তার সব কথা আমাকে মেনে চলতে হবে।
আমি সেদিন বুঝতে পারছিলাম না, আমার কি করা উচিৎ।
সেইরাতও আমার স্বপন মামার সাথেই কাটাতে হয়।

এরপর থেকেই জীবনের প্রতি, মানুষের প্রতি আমার ঘৃণা জন্মাতে থাকে।
অপরাধ বোধ আমাকে ঘিরে ধরে মাকড়শার জালের মতো।
কয়েক বছর গেলো আমার এভাবে।
কেউ জানতো না আমার এই গোপন কষ্টের কথা।
আমি বড় হতে থাকি।
এরপর আমার জীবনে আসে আমারই আপন মামাতো ভাই —
প্রান্ত।
প্রান্ত আর আমার মাঝে ভালোবাসার সম্পর্ক গড়ে ওঠে খুব গোপনে।

এরপর আমরা পালিয়ে রাজবাড়ি থেকে চলে আসি ঢাকা।
ভেবেছিলাম বিয়ে করতে পারবো দুজন।
কিন্তু না —
আমার বয়স কম থাকায় বিয়ে রেজিস্টারি করতে পারিনা।
আমরা কয়েক দিন বিভিন্ন জায়গাবদল করতে থাকি।
তারপর,,
তারপর একদিন কমলাপুর ষ্টেশনে —
আমার পরিচয় হয় মাজেদা খালার সাথে।
তিনি আমাকে ভালো বেতনে কাজ একটা দেবে বলে নিয়ে যান মহম্মদপুরের একটা বাসায়।
সেই বাসায় একগ্লাস কমলারঙের শরবত খাওয়ার পর আমি আর কিছু জানিনা।
আমার পুরো সেন্স আসার পর দেখি আমি ইন্ডিয়ার শিলং এ একটা হোটেলে।
চারপাশে খুঁজতে থাকি প্রান্তকে।
চিৎকার করে কান্না করি। কিন্তু তখন আমি কচুরিপানার মতো ভেসে যে দূর থেকে বহুদূরে।
পরে আমি জানতে পারি —
মাজেদা নামের সেই মহিলা আর কেউ না, সে নারী পাচারকারী দলের অন্যতম সদস্য।
সেই মাজেদা আমাকে রঞ্জিত ধরের কাছে ৯০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয়।

আমি হাত বদল হতে থাকি এক এক রাত একজনের কাছে।
মাকে, মনে পড়ে, দেশকে মনে পড়ে।
আমার গ্রাম, আমার রাজবাড়ি জেলা, সব মনে পড়ে।
আমি পাঁচবছর পর রঞ্জিত ধরের হাত থেকে পালিয়ে আসি।
মাধব আমাকে সাহায্য করে পালিয়ে আসতে।
মাধবেরও ঐ হোটেলে নিয়মিত যাতায়াত ছিল,
আমাকে ও ভালোবাসার গান শুনাইত।
মাধবই আমাকে শিলং থেকে কলকাতার রাজাবাজার নিয়ে আসে।
কিছুদিন আমাদের দুজনার রাজাবাজারে ভালই কাটে।
কদিন পরই মাধবের আসল রুপ ফুটে ওঠে।
মাধব নেশা করতে করতে আমার গায়ে হাত তুলতে শুরু করে।
ওর বন্ধু পরিচিতদের হাতে আবার আমাকে তুলে দিতে থাকে টাকার বিনিময়ে।
এরপর রাজাবাজারের সেই বাসা থেকে একদিন—-
আমিই আবার পালিয়ে শ্যামনগর আসি।

শ্যামনগর বাসস্টপে প্রথম পরিচয় হয় সাংবাদিক দাদা প্রদীপ কুমারের সাথে।
প্রদীপ দার কাছেই আমার জীবনের গল্প বলি।
আমি ঘরে ফিরতে চাই।
পনেরো বছর ধরে মা, তন্দ্রা, তীর্থ কেমন আছে জানতে চাই।
একদিনের জন্য ফিরতে চাই আমার মামাবাড়িতে।
প্রান্তকে বলতে চাই আমি কিভাবে সেদিন নিখোঁজ হয়েছিলাম।
কেন ওকে কিছু না জানিয়ে মাজেদা খালার সাথে গিয়েছিলাম।
প্রান্ত এখন কেমন আছে?
ও কি বিয়ে করেছে? ছেলেমেয়ে ?
আমাকে কি মনে আছে ওর? খুব রাগ আমার উপর তাইনা, আমি ওকে ছেড়ে গিয়েছি বলে?
আমি প্রান্তর কাছে হাত জোড় করে ক্ষমা চাইবো।
যদি কখনো দেখা হয় ওর পা ধরে বলবো আমার সেদিনের অপারগতার কথা।
আমি যে ওকে আজও অনেক অনেক ভালোবাসি।

মাকে খুব মনে পড়ে।
মায়ের জন্য টাকা জমিয়ে রেখেছি।
মাকে দিতে চাই অনেক টাকা।
আর সেই জানোয়ার স্বপন মামা?
তার সামনেও গিয়ে একটাবার দাঁড়াতে চাই।
একটা দিন, আমি একদিনের জন্য আমার দেশ, বাংলাদেশে ফিরতে চাই।
আমি বাংলাদেশে ফিরতে চাই।
প্লিজ হেল্প মি —
হেল্প মি।
হেল্প মি।
এই আমি “তনুশ্রী গাইন” থেকে আবার “তনু” হতে চাই।

১০ ডিসেম্বর ২০১৮
নৌ সদর দপ্তর বনানী ঢাকা।

Total View: 326

    আপনার মন্তব্য





সারাদেশ

কক্সবাজার

কিশোরগঞ্জ

কুড়িগ্রাম

কুমিল্লা

কুষ্টিয়া

খাগড়াছড়ি

খুলনা

গাইবান্ধা

গাজীপুর

গোপালগঞ্জ

চট্টগ্রাম

চাঁদপুর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চুয়াডাঙা

জয়পুরহাট

জামালপুর

ঝালকাঠী

ঝিনাইদহ

টাঙ্গাইল

ঠাকুরগাঁও

ঢাকা

দিনাজপুর

নওগাঁ

নড়াইল

নরসিংদী

নাটোর

নারায়ণগঞ্জ

নীলফামারী

নেত্রকোনা

নোয়াখালী

পঞ্চগড়

পটুয়াখালি

পাবনা

পিরোজপুর

ফরিদপুর

ফেনী

বগুড়া

বরগুনা

বরিশাল

বাগেরহাট

বান্দরবান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ভোলা

ময়মনসিংহ

মাগুরা

মাদারীপুর

মানিকগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জ

মেহেরপুর

মৌলভীবাজার

যশোর

রংপুর

রাঙামাটি

রাজবাড়ী

রাজশাহী

লক্ষ্মীপুর

লালমনিরহাট

শরীয়তপুর

শেরপুর

সাতক্ষীরা

সিরাজগঞ্জ

সিলেট

সুনামগঞ্জ

হবিগঞ্জ

Flag Counter