বৃহস্পতিবার,  ২৬শে নভেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,  ১১ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,  সন্ধ্যা ৬:৩৮

নতুন মাদক ‘খাত’ বাংলাদেশে আনছে ২১ প্রতিষ্ঠান

সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৮ , ০৯:৩০

টি.এম গোলাম মোস্তফা
দেশের মাদকের তালিকায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে এনপিএস বা ইথিওপিয়ান গাঁজা। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এর নাম দিয়েছে ‘খাত’। এটিকে ‘খ’ পর্যায়ের মাদক বলা হচ্ছে। এই খাত দেখতে অনেকটা চায়ের পাতার মতো হওয়ায় চায়ের নাম করে এটি দেশে এনে বিদেশে পাঠানো হচ্ছে। আর চা রফতানির নামে ২১টি প্রতিষ্ঠান এই ব্যবসা করছে।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তে এসব তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, ইথিওপিয়া থেকে খাতের চালান আনার পর তা ভেঙে ভাগ ভাগ করে বিভিন্ন দেশে পাঠিয়েছে এসব প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘদিন ধরে এই কাজ করছে। তারা চায়ের নাম করে ব্যবসা চালাচ্ছে। কখনো নামে, আবার কখনো বেনামে আনছে এ খাত। প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম জানা গেলেও তাদের বিষয়ে এখনো পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া যায়নি।

পর্যায়ক্রমে ২১টি প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে সব ধরনের তথ্য সংগ্রহের পর তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে মাঠে নামবে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, চায়ের পাতার মতো দেখতে ওই পাতার নাম নিউ সাইকোট্রফিক সাবস্ট্যানসেস বা এনপিএস। এটি যেমন চিবিয়ে খাওয়া হয়, তেমনি চায়ের মতোও পান করা যায়।

সম্প্রতি দেশে খাতের কয়েকটি বড় চালান আটক করেছে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর, পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) ও ঢাকা কাস্টমসের সদস্যরা। সড়কপথে এসব খাতের চালান না এনে প্রতিষ্ঠানগুলো আকাশপথকে ব্যবহার করছে। আকাশপথের পাশাপাশি বৈদেশিক ডাক বিভাগকেও ব্যবহার করত চক্রটি। বিভিন্ন কারণেই বাংলাদেশকে খাতের চালান পাঠানোর নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছিল তারা।

গত ৩১ আগস্ট খাতের প্রথম চালানটি আটক করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। অভিযান চালিয়ে ৮৬১ কেজি খাতসহ নাজিম নামের এক যুবককে গ্রেফতার করা হয়। পরে তার মাধ্যমে পল্টন ও কাকরাইল এলাকায় অভিযান চালায় অধিদফতর।

খাতের ওই চালানটি এসেছিল ইথিওপিয়ার রাজধানী আদ্দিস আবাবা থেকে। পাঠানো হয়েছিল ঢাকার নওয়াহিন এন্টারপ্রাইজের জিয়াদ মহম্মদ ইউসুফ নামের এক ব্যক্তির কাছে।

৬ সেপ্টেম্বর ধরা পড়ে খাতের আরেকটি চালান। এটি এসেছিল ভারতের মুম্বাই থেকে। ওইদিন ৯টি সন্দেহজনক কার্টন দেখে আটক করে তাতে খাত পাওয়া যায়।

৮ সেপ্টেম্বর রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ইউনিটের ভেতর থেকে ১৬০ কেজি এনপিএস তথা খাত আটক করে শুল্ক বিভাগ। সর্বশেষ ১০ সেপ্টেম্বর ১ হাজার ৬০০ কেজি খাত আটক করে সিআইডি।

এসব খাত কখনো প্রতিষ্ঠান, কখনো ব্যক্তির নামে এসেছে। এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের হাতে গ্রেফতারকৃত মোহাম্মদ নাজিম নানা গুরুত্বপূর্ণ তথ্য দিয়েছেন।

এই নাজিম একসময় মধ্যপ্রাচ্যে থাকতেন। তার গ্রামের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলায়। তার বাবা দুবাই সেনাবাহিনীর বেসরকারি স্টাফ ছিলেন। সেখানে তার ব্যবসা ও দোকান ছিল। এসব তথ্য যাচাই-বাছাই চলছে। কিন্তু তিনি কেন এসব ছেড়ে দেশে এলেন, সে বিষয়ে তদন্ত চলছে।

নাজিমের ভাষ্য, এর আগে ৫০ কেজির একটি চালান নিজের নামে এনেছিলেন তিনি। দ্বিতীয় চালানটি ধরা পড়ে যায়। তৃতীয় চালানটি তার গুদাম থেকে উদ্ধার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতর। তিনি এসব চালান বাইরের দেশে রফতানি করতেন। দেশে আনার পর সেই চালান ভেঙে পাঁচ, ১০ ও এক কেজি করে প্যাকেট করা হতো। তারপর সেই প্যাকেট নিজের নামে বৈদেশিক (পার্সেল) ডাকযোগে বিদেশে পাঠাতেন। তাকে আগে থেকেই ওই দেশ, ব্যক্তি ও তাদের ঠিকানা দেওয়া হতো। অর্ডার অনুযায়ী ডাকযোগে তিনি তা পাঠাতেন।

নাজিমের মাধ্যমে এখনো খাতের দেশীয় বাজার তৈরি হয়নি বলে নিশ্চিত হয়েছে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা। কিন্তু তাকে ব্যবহার করা হতো। আর কে তাকে ব্যবহার করত, তার খোঁজ চলছে। তার পাশাপাশি ভিন্ন কোনো প্রতিষ্ঠান দেশীয় বাজার তৈরিতে কাজ করেছে কি না, তা এখনো বের হয়নি।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য

খাতের চালান এখনো দেশে আসছে স্বীকার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের এক কর্মকর্তা জানান, আবারও দুই-একদিনের মধ্যে আরও কয়েকটি খাতের চালান ধরা পড়বে।

দেশে ২১ প্রতিষ্ঠানের খাত আনার বিষয়টি স্বীকার করে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের কর্মকর্তা মেহেদী হাসান বলেন, ‘যারা এসব খাত আনছে, তাদের ব্যাপারে আমরা তথ্য পেয়েছি। এসব প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে যাচাই-বাছাই চলছে। তারা গ্রিন টিয়ের নাম করে এসব বিদেশে পাঠাত।’

‘তারা একই ব্যক্তির নামে নাকি ভিন্ন নামে এসব মাদক আনত এবং বিদেশে পাঠাত, তা তদন্ত করা হচ্ছে। ভিন্ন ভিন্ন ঠিকানায় আনা হয়েছে এসব খাতের চালান। তবে ঠিকানাগুলো সঠিক কি না, তাও যাচাই করা হচ্ছে।’

তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, খাত সেবন কেনিয়ায় বৈধ। তারা চাষ করে খায়। এ ছাড়াও ইথিওপিয়া, আলবেনিয়া, তিউনিসিয়া ও মধ্য আফ্রিকায় এই খাতের চাষ হয়ে থাকে। তারা এটাকে মাদক হিসেবেই ব্যবহার করে থাকে। কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশগুলোতে খাত বৈধ।

ওইসব দেশ থেকে সরাসরি ইউরোপ-আমেরিকায় পার্সেল পাঠানো নিষেধ। সেখান থেকে তা পাঠানোও কঠিন। এসব কারণে পাচারকারী চক্র বাংলাদেশকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে।

এটা বাংলাদেশে কেন আনা হচ্ছে, এ বিষয়ে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রিন-টি হিসেবে আনার পর সেগুলো গ্রিন-টি হিসেবেই ইউরোপের দেশগুলোতে পাঠানো হচ্ছে। আর বাংলাদেশ, ভারত ও শ্রীলঙ্কাসহ এশিয়ার কয়েকটি দেশে চা উৎপাদন হয় বলে খুব সহজেই এটি চা নামে আনা যায়। এ ছাড়া চা নাম দিয়ে বিদেশে রফতানিও করা যায় খুব সহজে; কেউ সন্দেহও করে না।

এই খাত পরীক্ষার মতো তৎক্ষণাৎ কোনো ব্যবস্থা নেই। ফলাফল পাওয়াটাও কঠিন বলে বৈদেশিক ডাক বিভাগগুলোর অফিসগুলোকে ব্যবহার করা হচ্ছে। এসব কারণেই বাংলাদেশকে ২১ প্রতিষ্ঠান নিরাপদ রুট হিসেবে নিয়েছে।

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, বাংলাদেশে খাতের কয়েকটি চালান আটকের আগে গত জুনে ভারতে একটা বড় চালান ধরা পড়ে। সেই খাত ধরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারতের আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সচেতন হয়ে যায়। এর আগে চক্রটি ভারতকে নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করত। পরে কৌশল পাল্টায় তারা। বাংলাদেশকে রুট হিসেবে ব্যবহার করতে শুরু করে।

এ বিষয়ে সিআইডির অর্গেনাইজড ক্রাইম বিভাগের উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) শাহ আলম বলেন, ‘যে ঠিকানাগুলো দেওয়া হয়েছে, সেগুলো সঠিক কি না, তা যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। এগুলো পোস্ট অফিসের মাধ্যমে এসেছে, কোনো বহনকারী নেই। কিন্তু যারাই জড়িত থাকবে, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। তদন্তে এর সঙ্গে জড়িত দেশি-বিদেশি চক্রটিকে আমরা শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে পারব।’

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের পরীক্ষাগারের প্রধান রাসায়নিক পরীক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহা বলেন, ‘বিমানবন্দরের পোস্ট অফিস থেকে জব্দকৃত গ্রিন-টি নামে আসা চালানটি পরীক্ষায় নতুন মাদক ‘‘খাত’’ বলে প্রমাণিত হয়েছে।’

দুলাল জানান, খাত খেলে উত্তেজনা আসে। এর পাতা চায়ের সঙ্গে ভিজিয়ে খেলে ঘণ্টাখানেকের মধ্যে প্রতিক্রিয়া শুরু হয়ে যায়। ক্ষুধা লাগে না, সেবনকারী অস্বাভাবিক আচরণ করে। ক্যাথিন ও ক্যাথিনন নামের দুটি উপাদান থাকে খাতে, যা ইয়াবার মতোই কাজ করে।

Total View: 831

    আপনার মন্তব্য





সারাদেশ

কক্সবাজার

কিশোরগঞ্জ

কুড়িগ্রাম

কুমিল্লা

কুষ্টিয়া

খাগড়াছড়ি

খুলনা

গাইবান্ধা

গাজীপুর

গোপালগঞ্জ

চট্টগ্রাম

চাঁদপুর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চুয়াডাঙা

জয়পুরহাট

জামালপুর

ঝালকাঠী

ঝিনাইদহ

টাঙ্গাইল

ঠাকুরগাঁও

ঢাকা

দিনাজপুর

নওগাঁ

নড়াইল

নরসিংদী

নাটোর

নারায়ণগঞ্জ

নীলফামারী

নেত্রকোনা

নোয়াখালী

পঞ্চগড়

পটুয়াখালি

পাবনা

পিরোজপুর

ফরিদপুর

ফেনী

বগুড়া

বরগুনা

বরিশাল

বাগেরহাট

বান্দরবান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ভোলা

ময়মনসিংহ

মাগুরা

মাদারীপুর

মানিকগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জ

মেহেরপুর

মৌলভীবাজার

যশোর

রংপুর

রাঙামাটি

রাজবাড়ী

রাজশাহী

লক্ষ্মীপুর

লালমনিরহাট

শরীয়তপুর

শেরপুর

সাতক্ষীরা

সিরাজগঞ্জ

সিলেট

সুনামগঞ্জ

হবিগঞ্জ

Flag Counter