বুধবার,  ২৩শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,  ৮ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,  বিকাল ৩:৫৬

নড়িয়ায় পদ্মা নদীর অব্যাহত ভাঙ্গনে দেখা দিয়েছে মানবিক বিপর্যয়

সেপ্টেম্বর ১৬, ২০১৮ , ০৯:৪৪

স্টাফ রিপোর্টার
পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গনের কবলে পরেছে নড়িয়াবাসী। নড়িয়া উপজেলার মোক্তারেরচর, কেদারপুর ইউনিয়ন এবং নড়িয়া পৌরসভার প্রায় ১০ কিলো মিটার এলাকা নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ফলে ক্রমশই ছোট হয়ে আসছে নড়িয়া শহরের মানচিত্র। এ উপজেলার অপেক্ষাকৃত গরীব লোকদের পাশাপাশি স্বচ্ছল পরিবারগুলো তাদের বসত বাড়ি হারিয়ে আশ্রয় নিচ্ছেন অন্যের জমিতে অথবা খোলা আকাশের নীচে।
গত এক মাসে পদ্মা নদীর ভয়াবহ ভাঙ্গনে বিলীন হয়েছে প্রায় ছয় হাজার পরিবারের বসত বাড়ি, ফসলি জমি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান। সেই সাথে এলাকার বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি হাসপাতাল, বেসরকারি ক্লিনিক, মসজিদ, মন্দির, পাকা সড়ক, বিদ্যুৎ লাইনসহ সামাজিক প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে।


সেখানে দেখা দিয়েছে সামাজিক, মানবিক এবং প্রকৃতিক বিপর্যয়। সহায় সম্ববহীন হাজার হাজার মানুষ তাদের মাথা গোজার ঠাঁই হারিয়ে দিশেহারা হয়ে উঠেছে। তারা এখন অনাহারে অর্ধাহারে জীবন যাপন করছে। চাহিদার তুলনায় অল্পপরিমাণ ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে তাদের পাশে দাড়িয়েছে উপজেলা প্রশাসন। সরকারের প্রতি পর্যাপ্ত পরিমাণ ত্রান সামগ্রী বিতরণের দাবী জানিয়েছে ক্ষতিগ্রস্থরা। এদিকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাদের জন্য খোলা হয়নি কোন আশ্রয় কেন্দ্র।
উপজেলা প্রশাসন বলছে, নড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ২৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বন্যা আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে। প্রয়োজনে সেখানে গিয়ে ক্ষতিগ্রস্থরা আশ্রয় নিতে পারেন। কিন্তু এলাকার জনপ্রতিনিধি এবং শিক্ষা বিভাগ বলছেন, এ বিষয়ে জেলা বা উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোন নির্দেশনা পাওয়া যায়নি।


সরেজমিনে ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে অন্যচিত্র। শোনা গেছে অসহায় মানুষের বুকফাটা গগণ বিদারী আর্তনাদের করুণ চিৎকার। প্রশাসনের দেয়া বক্তব্যের সাথে ক্ষতিগ্রস্থদের কথার কোন মিল পাওয়া যায়নি। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নড়িয়া উপজেলার বিভিন্ন স্থানে যে ২৮টি আশ্রয় কেন্দ্র রয়েছে, তাতে সরকারী নির্দেশনা না থাকায় কোন ক্ষতিগ্রস্থ পরিবার আশ্রয় নিতে পারেনি।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ২ জানুয়ারী জাজিরার কুন্ডেরচর থেকে নড়িয়ার সুরেশ্বর পর্যন্ত প্রায় ৯ কিলো মিটার এলাকায় পদ্মার ডান তীর প্রতিরক্ষায় স্থায়ী বাঁধ নির্মাণের জন্য সরকার ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেন। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে সুষ্ক মৌসুমে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করা যায়নি। বর্তমানে ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় প্রতিরক্ষামূলক কাজ করার জন্য ২০ কোটি টাকার আবেদন করা হয়েছিলো। কিন্তু অনুমোদন পাওয়া গেছে মাত্র ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা। যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। কিন্তু এতো টাকা খরচ করেও কোন ফল আসছে না।পদ্মার ভাঙ্গন বেড়েই চলেছে।


নড়িয়ার সাবেক পৌর মেয়র হায়দার আলীর মেহগনি বাগানে আশ্রয় নেয়া ৬৫ বছরের বৃদ্ধ আবদুল কাদের ফকির বলেন, আমার বাড়ি ছিলো কেদারপুর ইউনিয়নে। পদ্মা নদী আমার বাড়িঘর জমিজমা সব কেড়ে নিয়েছে। আমি এখন নিঃস্ব। আমার বলতে আমি ছাড়া আর কিছুই নেই। আমি এখন হায়দার আলীর মেহগনি বাগানে আশ্রয় নিয়েছি। আমার ঘর নেই। রাতে এই ছাবরার ভিতর ঘুমাই। আর দিনের বেলা রাস্তায় রাস্তায় ঘুড়ে বেড়াই। এখানে আমার মতো আরো ২৬টি পরিবার আশ্রয় নিয়েছে। সরকারী ভাবে একদিন ২৫ কেজি চাল পেয়েছি। এ ছাড়া আর কিছু পাইনি।
হায়দার আলীর মেহগনি বাগানে আশ্রয় নেয়া ৫৮ বছরের আরেক বৃদ্ধ শাহাবুদ্দিন বেপারী বলেন, আমার ঘরবাড়ি সব ছিলো। এখন কিছুই নেই। পদ্মা সব গিলে খেয়েছে। আমরা এখন খোলা আকাশের নীচে বসবাস করছি। সরকার যদি আমাদের জন্য একটি আশ্রয় কেন্দ্রের ব্যবস্থা করতো তাহলে ভালো হতো।


সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্থ কেদারপুর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান ইমাম হোসেন দেওয়ানের সাথে আলাপ কালে তিনি বলেন, আমার সব ছিলো। এখন কিছুই নেই। আমি এখন নিঃস্ব। আমি আশ্রয় নিয়েছি আমার এক আত্মীয়ের বাড়িতে। প্রশাসনের কাছে আমার জোর দাবী নড়িয়াকে যেন দুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষনা করা হয়।
ভাঙ্গন কবলিত এলাকার বাসিন্দা এবং স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ বাস্তবায়ন কমিটির আহবায়ক এ্যাডভোকেট আবুল কালাম আজাদ (গেরিলা আজাদ)’র সাথে আলাপ কালে তিনি বলেন, চলতি বছরের জানুয়ারী মাসের ২ তারিখে প্রথম বৈঠকে একনেকের সভায় পদ্মার ডান তীর রক্ষার জন্য ১ হাজার ৯৭ কোটি টাকা অনুমোদন দেয়া হলেও একটি মহলের অবহেলার কারণে গত শুস্ক মৌসুমে বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু করতে পারেনি। এখন জরুরী ভিত্তিতে যে জি.ও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে তা অপরিকল্পিত। এতে কোন উপকার হচ্ছে না। নদী যেভাবে ভাঙ্গছে তাতে আমাদের নড়িয়া সদরের অস্তিত্ব আগামী এক মাসের মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে। ছোট হয়ে যাবে নড়িয়া উপজেলার মানচিত্র।


নড়িয়া পৌরসভার মেয়র শহিদুল ইসলাম বাবু রাড়ি’র সাথে আলাপ কালে তিনি বলেন, এ বছরের ভাঙ্গনে নড়িয়া পৌরসভার ২ এবং ৪ নং ওয়ার্ডের ৮০ শতাংশ অর্থাৎ ১ হাজার ৭ শতটি পরিবারের বাড়িঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের গাফিলতি আর রাজনৈতিক নেতাদের সমন্বয়হীনতার কারণে আজ আমরা আমাদের অস্তিত্ব হারাতে বসেছি। এখনো যদি স্থায়ী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের কাজ শুরু না করা হয়, তাহলে নড়িয়া বাজারসহ অন্তত ২০টি স্কুল-কলেজ, পৌর ভবন, উপজেলা কমপ্লেক্স, হাসপাতাল, খাদ্য গুদাম সব কিছু বিলীন হয়ে যাবে।
এ ব্যাপারে শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শেখ মোঃ শফিকুল ইসলামের সাথে মুঠোফোনে আলাপ কালে তিনি বলেন, নদী ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় প্রতিরক্ষার জন্য জরুরী ভিত্তিতে ৭ কোটি ২০ লাখ টাকা মূল্যের জি.ও ব্যাগ ফেলা হচ্ছে। প্রয়োজনে আরো বরাদ্দ বাড়ানো হবে।
এ ব্যাপারে নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সানজিদা ইয়াছমিনের সাথে মুঠোফোনে আলাপ কালে তিনি বলেন, আমরা ৩ হাজার ৫শ পরিবারকে ৩০ কেজি করে ত্রাণের চাল বিতরণ করেছি। পাশাপাশি ঘর তোলার জন্য ৭শ পরিবারকে ২ বান্ডেল করে ঢেউ টিন বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

Total View: 551

    আপনার মন্তব্য





সারাদেশ

কক্সবাজার

কিশোরগঞ্জ

কুড়িগ্রাম

কুমিল্লা

কুষ্টিয়া

খাগড়াছড়ি

খুলনা

গাইবান্ধা

গাজীপুর

গোপালগঞ্জ

চট্টগ্রাম

চাঁদপুর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চুয়াডাঙা

জয়পুরহাট

জামালপুর

ঝালকাঠী

ঝিনাইদহ

টাঙ্গাইল

ঠাকুরগাঁও

ঢাকা

দিনাজপুর

নওগাঁ

নড়াইল

নরসিংদী

নাটোর

নারায়ণগঞ্জ

নীলফামারী

নেত্রকোনা

নোয়াখালী

পঞ্চগড়

পটুয়াখালি

পাবনা

পিরোজপুর

ফরিদপুর

ফেনী

বগুড়া

বরগুনা

বরিশাল

বাগেরহাট

বান্দরবান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ভোলা

ময়মনসিংহ

মাগুরা

মাদারীপুর

মানিকগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জ

মেহেরপুর

মৌলভীবাজার

যশোর

রংপুর

রাঙামাটি

রাজবাড়ী

রাজশাহী

লক্ষ্মীপুর

লালমনিরহাট

শরীয়তপুর

শেরপুর

সাতক্ষীরা

সিরাজগঞ্জ

সিলেট

সুনামগঞ্জ

হবিগঞ্জ

Flag Counter