বৃহস্পতিবার,  ২২শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,  ৬ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,  সন্ধ্যা ৭:০৬

বেনাপোল চোরাচালানের নিরাপদ আন্তর্জাতিক রুট

ডিসেম্বর ২৩, ২০১৭ , ২১:১৩

বিশেষ প্রতিনিধি টি.এম গোলাম মোস্তফা

বাংলাদেশের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে সোনার দাম বেশি হওয়ায় এ সীমান্ত পথে পাচার করছে আন্তর্জাতিক স্বর্ণ ও হুন্ডির চোরাচালান।
বেনাপোল সীমান্ত থেকে কলকাতার দূরত্ব মাত্র প্রায় ৮৪ কিলোমিটার। আর যাতায়াত ব্যবস্থাও ভালো, ফলে এ সুযোগে চোরাচালানীরা প্রতিদিন কেজি কেজি সোনা পাচার অব্যাহত রেখেছে। তবে রাঘব-বোয়ালরা থেকে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাইরে। আজ পর্যন্ত শত শত মামলা হলেও একটি মামলায় ওই রাঘব-বোয়ালদের সাজা হয়নি।
বিজিবি এবং কাস্টমস সূত্র মতে, গত ১০ মাসে ভারতে পাচারের সময় ৩৭২ পিস বা প্রায় ৪৩ কেজি স্বর্ণসহ ৩৬ পাচারকারীকে আটক হয়েছে। এর মধ্যে, গত ১২ ফেব্রুয়ারি দৌলতপুর বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা বড় আঁচড়া গ্রামের বজলুর রহমানকে ১৪ পিস স্বর্ণের বিস্কুটসহ আটক করে।
৪ মার্চ দৌলতপুর বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা গাতীপাড়া গ্রামের টিটু বিশ্বাসকে ২০ পিস স্বর্ণসহ আটক করে। বেনাপোল বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা ১ এপ্রিল শামীম হোসেন এবং হোসেন আলীকে ১৫ স্বর্ণের বারসহ আটক করে। ২৭ মে সীমান্তের দৌলতপুর ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা ২ কেজি ৩শ’ গ্রাম ওজনের ২০টি স্বর্ণের বিস্কুটসহ বড়আঁচড়া গ্রামের মনিরুজ্জামানকে আটক করে। পুটখালী ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা ৩০ মে মনির হোসেনকে ১০ পিস স্বর্ণের বিস্কুটসহ আটক করে। এছাড়া চলতি বছরের ৫ জুন পুটখালী বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা বাবুল হোসেনকে ১০টি স্বর্ণের বারসহ আটক করে।
স্থলবন্দর বেনাপোল চেকপোস্টে গত ৮ দিনে ৫ ভারতীয় নাগরিকের কাছ থেকে প্রায় ৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ করেছে বেনাপোল শুল্ক গোয়েন্দা ও বিজিবি সদস্যরা। এ নিয়ে চলতি বছরে গত ১০ মাসে বেনাপোল সীমান্ত থেকে প্রায় ৪৩ কেজি স্বর্ণ জব্দ করেছে প্রশাসনের বিভিন্ন সংস্থা।
এছাড়া প্রায় ২ কোটি হুন্ডির টাকা জব্দ হয়েছে। জানা গেছে, বিভিন্ন সময় স্বর্ণের এসব চালান ধরাপড়ায় পাচারকারীরা কৌশল বদল করে তাদের কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
এদিকে বেনাপোলের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে অবৈধপথে স্বর্ণ পাচারের সময় স্বর্ণসহ পাচারকারীরা বিজিবির হাতে আটক হওয়ায় কৌশল বদল করেছে আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালানীরা। এবার তারা পাসপোর্ট যাত্রীদের মাধ্যমে বেনাপোল আন্তর্জাতিক চেকপোস্ট দিয়ে ভারতে পাচার করছে স্বর্ণের বার।
সূত্র জানায়, পাসপোর্ট যাত্রীদের মাধ্যমে স্বর্ণ পাচারের সময় গত ১১ জুলাই নারায়ণগঞ্জের আবু সালামকে বেনাপোলের ওপারে ভারতের হরিদদাসপুর আইসিপির কাস্টমস সদস্যরা ২০ স্বর্ণের বারসহ আটক করে। যার ওজন প্রায় ২ কেজি ৩শ’ গ্রাম। বাংলাদেশি পাসপোর্ট যাত্রী ভারতে স্বর্ণসহ আটকের পর বেনাপোল চেকপোস্টের কাস্টমস কর্তৃপক্ষ নড়েচড়ে বসে।
বর্হিগমন চেক পয়েন্টের স্ক্যানিং মেশিনটি দ্রুত মেরামত করে চালু করে। তার পরের দিন অর্থাৎ ১২ জুলাই বেনাপোল কাস্টমস হাউসের শুল্ক গোয়েন্দা সদস্যরা চেকপোস্ট এলাকা থেকে ভারতগামী পাসপোর্ট যাত্রী পারভেজকে ৭ স্বর্ণের বিস্কুটসহ আটক করে। জুতার সোলের মধ্যে লুকিয়ে এ সোনা পাচার করা হচ্ছিল বলে শুল্ক গোয়েন্দারা জানায়।
১৪ জুলাই পাসপোর্ট যাত্রী জালাল আহমেদ সেলিমকে ৫ পিস স্বর্ণের বিস্কুটসহ চেকপোস্ট কাস্টমস এলাকা থেকে শুল্ক গোয়েন্দারা আটক করে। ১৫ জুলাই ২ কেজি ৭শ’ ৫০ গ্রাম ওজনের ১১ পিস স্বর্ণের বারসহ পাসপোর্ট যাত্রী ঢাকার ওয়ারী এলাকার রুখসানা বেগমকে শুল্ক গোয়েন্দারা আটক করে। ১৭ জুলাই ১ কেজি ২শ’ ৫০ গ্রাম ওজনের ৫ পিস স্বর্ণের বারসহ মুন্সিগঞ্জ জেলার টুঙ্গিবাড়ী থানার মৃত সামসুল হকের ছেলে সেলিমকে আটক করে কাস্টমসের সদস্যরা।
২৫ জুলাই নারায়ণগঞ্জের হারুন আল কবির ও আরিফুল হককে ৪টি স্বর্ণের বারসহ আটক করে। ২৮ জুলাই একজন ভারতীয় ও একজন বাংলাদেশিকে ৪ স্বর্ণের বারসহ আটক করে ভারতের পেট্রোপোল কাস্টমস সদস্যরা। ৮ আগস্ট ৪ কেজি ওজনের ৩৫ পিস স্বর্ণের বারসহ শার্শা উপজেলার নুর ইসলামের ছেলে আব্দুল মমিনকে আটক করে পুটখালী বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা। ১০ আগস্ট ১ কেজি ২শ’ গ্রাম ওজনের ১২ পিস স্বর্ণের বারসহ আশিক নামে একজনকে আটক করে বেনাপোল চেকপোস্ট বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা।
১৮ আগস্ট ১ কেজি ৪শ’ গ্রাম ওজনের ১৪ পিস স্বর্ণের বারসহ কদর আলী নামে একজন পাচারকারীকে আটক করে বেনাপোল সদর ক্যাম্পের সদস্যরা। ৫ অক্টোবর শরিয়তপুরের সুজন মিয়া ও মাদারীপুরের জনি মিয়াকে ৮ স্বর্ণে বারসহ আটক করে বেনাপোল কাস্টমসের শুল্ক গোয়েন্দা সদস্যরা। ৬ অক্টোবর পাসপোর্ট যাত্রী ঢাকার কদমতলীর মিজানুর রহমান ও কুমিল্লার চান্দিনার মাহবুব আলমকে ৭ স্বর্ণের বারসহ আটক করে বেনাপোল কাস্টমসের শুল্ক গোয়েন্দার সদস্যরা।
৯ অক্টোবর পাসপোর্ট যাত্রী কুমিল্লার মুরাদনগর এলাকার মকবুল হোসেনের ছেলে মাইনউদ্দিনকে ১০ স্বর্ণের বারসহ আটক হয়। ১০ অক্টোবর যশোর সদরের ডুমদিয়া গ্রামের কামাল হোসেনের ছেলে রিপনকে ১০টি সোনার বারসহ আটক করে বেনাপোল পুটখালী ক্যাম্পের বিজিবি সদস্যরা। ১৭ অক্টোবর ১৮ পিস সোনার বারসহ শ্রবন নামে উত্তর ২৪ পরগনার চড়ুইগাছি এলাকার এক ভারতীয় নাগরিককে আটক করে বেনাপোল আইসিপি বিজিবি ক্যাম্পের সদস্যরা।
২৯ নভেম্বর শরিয়তপুর জেলার জাজিরা থানার নওডুবা গ্রামের ইব্রাহিমের ছেলে ইলিয়াস ও গোপালগঞ্জ সদরের ঘোষেরচর এলাকার জাহাঙ্গীরের ছেলে মহসিনকে ১০ স্বর্ণে বারসহ আটক করে শুল্ক গোয়েন্দার সদস্যরা। ১ ডিসেম্বর ভারতীয় পাসপোর্টযাত্রী উত্তর ২৪ পরগনা জেলার ইকবালপুর থানার খিদিরপুর গ্রামের নূরুল হকের ছেলে নসরুল হক ও দিল্লীর উত্তম নগর এলাকার মেহেন্দার বর্মার ছেলে সঞ্জীব বর্মাকে ২০ স্বর্ণের বারসহ আটক করে শুল্ক গোয়েন্দার সদস্যরা। ৪ ডিসেম্বর ভারতীয় পাসপোর্টযাত্রী ধীমান সরকার, নিতীষ সিং ও মহেষ লাল শাহকে ১৭ পিস সোনার বারসহ আটক করে কাস্টমসের শুল্ক গোয়েন্দার সদস্যরা।
সর্বশেষ ৮ ডিসেম্বর বেনাপোলের পুটখালী গ্রামের আলী হোসেনের ছেলে ইমরান হোসেন ও রেজাউল ইসলামের ছেলে বিল্লাল হোসেনকে ৪ কেজি ২৮০ গ্রাম ওজনের ২৬ স্বর্ণের বারসহ বেনাপোল বন্দরের সামনে থেকে আটক করে বেনাপোল ৪৯ ব্যাটালিয়নের আইসিপি বিজিবি সদস্যরা।
সীমান্তের একটি সূত্র জানায়, ফেব্রুয়ারি-ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় ৪৩ কেজি স্বর্ণ আটক হলেও প্রতিদিন পাসপোর্ট যাত্রী এবং চোরাচালানীদের মাধ্যমে কেজি কেজি স্বর্ণ ভারতে পাচার হয়ে যাচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের চোখ ফাঁকি দিয়ে ঢাকা থেকে অনেক বার হাত বদল হয়ে সোনা পাচার হয় ভারতে।
প্রথমত ঢাকা থেকে ট্রেন অথবা বাসে একটি গ্রুপ সোনা নিয়ে বেনাপোলে আসে। পরিবহন কাউন্টার অথবা তাদের নির্ধারিত স্থানে স্বর্ণের চালানটি বদল হয় স্থানীয় এজেন্টদের হাতে। স্থানীয় এজেন্টের বহনকারীরা স্বর্ণের চালানটি নিয়ে চলে যায় গাতীপাড়া, দৌলতপুর, পুটখালী, পাচভুলোট, ঘিবা সীমান্তের কোন বাড়িতে। সেখান থেকে হাত বদল হয় শুধুমাত্র সীমান্ত পার করে ভারতীয় এজেন্টের হাতে পৌঁছানোর পর্যন্ত।
সূত্রটি আরো জানায়, স্বর্ণ পাচারকারী চক্রের সদস্যরা বিজিবির হাতে আটক হওয়ায় চক্রটি নতুন নতুন কৌশলে রাতে ও দিনে বেনাপোল বাজার থেকে স্বর্ণ নিয়ে সীমান্তে পৌঁছে দিচ্ছে। এছাড়া পুরুষ ও মহিলা পাসপোর্টযাত্রীরা ঢাকা থেকে স্বর্ণ নিয়ে বেনাপোল চেকপোস্ট দিয়ে ভারতে চলে যাচ্ছেন।
অপরদিকে হুন্ডির মাধ্যমে পাচার হচ্ছে কোটি কোটি টাকা। যৎ সামান্য পুলিশ, বিজিবি ও কাস্টমস সদস্যরা আটক করলেও সিংহভাগ চলে যাচ্ছে প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে। গত তিন মাসে হুন্ডির মাধ্যমে টাকা বা বৈদেশিক মুদ্রা পাচারের সময় কাস্টমস ও বিজিবি সদস্যরা প্রায় ২ কোটি টাকা আটক করেছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থা সহজ ও করিডোর থাকায় চোরাচালানীরা সোনা পাচারে এ পথ ব্যবহার করছে। সোনা যাদের কাছে পাওয়া যায়, বিজিবি কেবল তাদেরই আটক করে থাকে। পরে সরকারের অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী তা তদন্ত করে দেখেন। তবে কোন রাঘব-বোয়াল ধরা পড়ার কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। এর সঙ্গে নতুন করে যোগ হয়েছে বাংলাদেশী ২ ও ৫ টাকার নতুন নোট ভারতে পাচারের ঘটনা, কিছুদিন পূর্বেই ৫ টাকার নতুন নোট প্রায় ৪৫ হাজার টাকা মালিকবিহীন বিজিবি নোম্যান্সল্যান্ড থেকে উদ্ধার করে।
বিজিবির সিও জানান, স্বর্ণের চাহিদা বেশি থাকায় আন্তর্জাতিক স্বর্ণ পাচারকারী চক্রের সদস্যরা এখন ভারতে পাচার করছে। হুন্ডি, স্বর্ণ, আগ্নেয়য়াস্ত্র, মাদকদ্রব্যসহ অন্যান্য চোরাচালান পাচারকারীদের বিষয়ে বিজিবি সব সময় সতর্ক আছে বা থাকবে।
বেনাপোল কাস্টমস শুল্ক গোয়েন্দার ডেপুটি কমিশনার আব্দুস সাদেক বলেন, স্বর্ণেরবার ভারতে পাচার হচ্ছে এ ধরনের খবর পেয়ে আমরা স্বর্ণসহ পাচারকারীদের আটক করে থাকি। পাশাপাশি আমাদের গোয়েন্দারা সর্বদা সজাগ দৃষ্টি রাখেন, যাতে দেশের স্বর্ণ পাচার হয়ে বাইরে না যায়।
এ বিষয়ে বেনাপোল পোর্ট থানার ওসি অপূর্ব হাসান জানান, স্বর্ণ পাচারের কোন তথ্য পেলে তা তাৎক্ষণিক অভিযান চালিয়ে আটক করা হয়। বেনাপোল পোর্ট থানা বিগত দিনগুলোতে স্বর্ণের বড় বড় চালান আটক করেছে।

Total View: 1042

    আপনার মন্তব্য





সারাদেশ

কক্সবাজার

কিশোরগঞ্জ

কুড়িগ্রাম

কুমিল্লা

কুষ্টিয়া

খাগড়াছড়ি

খুলনা

গাইবান্ধা

গাজীপুর

গোপালগঞ্জ

চট্টগ্রাম

চাঁদপুর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চুয়াডাঙা

জয়পুরহাট

জামালপুর

ঝালকাঠী

ঝিনাইদহ

টাঙ্গাইল

ঠাকুরগাঁও

ঢাকা

দিনাজপুর

নওগাঁ

নড়াইল

নরসিংদী

নাটোর

নারায়ণগঞ্জ

নীলফামারী

নেত্রকোনা

নোয়াখালী

পঞ্চগড়

পটুয়াখালি

পাবনা

পিরোজপুর

ফরিদপুর

ফেনী

বগুড়া

বরগুনা

বরিশাল

বাগেরহাট

বান্দরবান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ভোলা

ময়মনসিংহ

মাগুরা

মাদারীপুর

মানিকগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জ

মেহেরপুর

মৌলভীবাজার

যশোর

রংপুর

রাঙামাটি

রাজবাড়ী

রাজশাহী

লক্ষ্মীপুর

লালমনিরহাট

শরীয়তপুর

শেরপুর

সাতক্ষীরা

সিরাজগঞ্জ

সিলেট

সুনামগঞ্জ

হবিগঞ্জ

Flag Counter