শনিবার,  ১৬ই জানুয়ারি, ২০২১ খ্রিস্টাব্দ,  ২রা মাঘ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,  সকাল ৮:৪৪

ভেদরগঞ্জে ‘অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান’ প্রকল্প মানেই শুভঙ্করের ফাঁকি!

জুন ১১, ২০১৮ , ২৩:৩১

শাকিল আহমেদ
শরীয়তপুর জেলার ভেদরগঞ্জ উপজেলার উত্তর তারাবুনিয়া, দক্ষিন তারাবুনিয়া, চরসেনসাস এবং আরশিনগর ইউনিয়নে ২০১৭-২০১৮ অর্থবছরে ‘অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান’ কর্মসূচি প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ে ৪টি ইউনিয়নের ২৭টি প্রকল্পের কাজে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।

ভেদরগঞ্জ উপজেলায় ‘অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান’ কর্মসূচি প্রকল্পের কাজ মানেই শুভঙ্করের ফাঁকি। ফলে সরকার যে উদ্দেশ্য নিয়ে এ প্রকল্প হাতে নিয়েছে সে উদ্দেশ্য বিফলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

সরকার মুলত গ্রামের অতিদরিদ্র কর্মবিমুখ বেকার যুবকদের কাজে ব্যাস্ত রাখার পাশাপাশি গ্রামের নারীদের ক্ষমতায়নের জন্য ২টি পর্যায়ে ৪০ দিন করে ৮০ দিনের কর্মসংস্থান প্রকল্প চালু করেন। আর সে প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের কাজে হয়েছে ব্যাপক অনিয়ম আর দুর্নীতি।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা কর্তৃক দ্বিতীয় পর্যায়ে সরবরাহকৃত তালিকার মাধ্যমে জানা যায়, ভেদরগঞ্জ উপজেলায় ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে রামভদ্রপুর ইউনিয়নে ৬টি, মহিষার ইউনিয়নে ৬টি, ছয়গাঁও ইউনিয়নে ৭টি, নারায়নপুর ইউনিয়নে ৩টি, ডি.এম. খালী ইউনিয়নে ৭টি, চরকুমারিয়া ইউনিয়নে ৬টি, সখিপুর ইউনিয়নে ৮টি, উত্তর তারাবুনিয়া ইউনিয়নে ৫টি, কাচিকাটা ইউনিয়নে ৯টি, চরভাগা ইউনিয়নে ৭টি, আরশি নগর ইউনিয়নে ৭টি, দক্ষিন তারাবুনিয়া ইউনিয়নে ৭টি এবং চরসেনসাস ইউনিয়নে ৮টি প্রকল্প বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

আর এ সকল প্রকল্পে কাজ করার জন্য শ্রমিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৩ হাজার ৬ শত ৬১ জন। আর এই ৩ হাজার ৬ শত ৬১ জন শ্রমিকের বিপরীতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ২ কোটি ৯২ লক্ষ ৮৮ হাজার টাকা। ভেদরগঞ্জ উপজেলার ১৩টি ইউনিয়নের মধ্যে উত্তর তারাবুনিয়া, দক্ষিণ তারাবুনিয়া, আরশিনগর এবং চরসেনসাস এই ৪টি ইউনিয়নের ২৭টি প্রকল্পে ১ হাজার ৬২ জন শ্রমিক কাজ করার জন্য বরাদ্দ দিয়েছেন। যার ৪০ দিনের পারিশ্রমিক হচ্ছে ১ কোটি ৬৯ লক্ষ ৯২ হাজার টাকা।

সরকারি বিধি মোতাবেক ৪টি ইউনিয়নে যে পরিমাণ শ্রমিক বরাদ্দ রয়েছে তার এক তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৩শ ৫৩ জন নারী শ্রমিক কাজ করার বিধান থাকলেও কোনো প্রকল্পেই কোনো নারী শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি। আর যে পরিমাণ পুরুষ শ্রমিক বরাদ্দ রয়েছে তার এক-চতুর্থাংশেরও কম শ্রমিক দিয়ে ঢিলে ঢালা ভাবে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করা হয়েছে।

কোন প্রকল্পেই কোন নাম ফলক বা সাইন বোর্ড লাগানো হয়নি। কিছু প্রকল্পের কাজ ভ্যাকু মেশিন দিয়ে করা হয়েছে। আর কিছু প্রকল্পের অস্তিত্বই খুঁজে পাওয়া যায়নি। সেখানে প্রকল্পের কাজ সঠিক ভাবে তদারকি করার জন্য ভেদরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কোন প্রতিনিধিকে পাওয়া যায়নি।

শুধু তা-ই নয়, ব্যাংকে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, প্রকল্পের নামে যেসব শ্রমিক দেখিয়ে ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে প্রকৃতপক্ষে সেসব শ্রমিক দিয়ে কাজ না করিয়ে অন্য জেলার শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হয়েছে। প্রত্যেকটি প্রকল্পের কাজ সরকারি বিধি মোতাবেক সম্পন্ন করার কথা থাকলেও চেয়ারম্যানরা সেই বিধি বিধানের তোয়াক্কা না করে তাদের ইচ্ছেমত মনগড়া নিয়মে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেছেন।

এদিকে ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সাব্বির আহমেদ দুর্নীতির ব্যাপারে যুদ্ধ ঘোষনা করেছেন। তিনি বাল্যবিবাহ বন্ধ, ড্রেজার এবং মাদক নির্মূলে সফল হয়েছে। তার এই কঠিন পদক্ষেপে উপজেলাবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে। কিন্তু তার নিয়ন্ত্রণাধীন প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল এবং উপ সহকারী প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন প্রতিনিয়ত অনিয়ম আর দুর্নীতি করেই চলেছেন।

সে ব্যাপারে তিনি কি ব্যবস্থা নিচ্ছেন তা সুশীল সমাজ দেখার জন্য অপেক্ষা করছে। সুশীল সমাজ আশা করছে, বাল্যবিবাহ বন্ধ, ড্রেজার এবং মাদক নির্মূলের মতো এ ব্যাপারটিও তিনি শক্ত হাতে দমন করবেন। তারই ধারাবাহিকতায় প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল এবং উপ সহকারী প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিনের ‘অতি দরিদ্রদের জন্য কর্মসংস্থান’ কর্মসূচি প্রকল্পে যে অনিয়ম আর দুর্নীতি করছেন তার আংশিক চিত্র তুলে ধরা হলো।

ভেদরগঞ্জের উত্তর তারবুনিয়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডে মাঝি বাড়ি থেকে উত্তর দিকে নমকান্দি প্রধান সড়ক পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণের জন্য ১০ লক্ষ ৬৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। সেখানে কাজ করার জন্য ১শ ৩৩ জন শ্রমিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে সেখানে ১৮ জন শ্রমিককে কাজ করতে দেখা গেছে। এ ব্যাপারে উত্তর তারাবুনিয়া ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডে জামালপুর জেলা থেকে কাজ করতে আসা গোলাম মোস্তফা, ইব্রাহিম খান, নাজমুল হোসেন বলেন, আমাদের বাড়ি জামালপুর জেলায়। আমরা এখানে প্রতি দিন সকাল ৭টা থেকে ৫টা পর্যন্ত ১৮ জন লোক কাজ করি। আমাদেরকে জনপ্রতি ৫শত টাকা করে দেয়া হয়।

এ বিষয়ে উত্তর তারাবুনিয়া ইউনিয়ন পরিষদের সচিব শিপন মিয়ার কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ বিষয়টি চেপে যান। এতো খোঁজ খবর নেয়ার দরকার নেই। চুড়ান্ত বিল পেলে আপনাদেরকে যথাযথ সম্মান করা হবে।

একই ভাবে ভেদরগঞ্জের দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডে আক্কাস প্রধানীয়ার বাড়ি হতে দক্ষিণ দিকে হামিদ মাষ্টারের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা পূণঃ নির্মাণের জন্য ২৮ জন শ্রমিক বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। আর এই ২৮ জন শ্রমিকের বিপরীতে রাস্তা নির্মাণের জন্য ২ লক্ষ ২৪ হাজার টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে কোন শ্রমিককে কাজ করতে দেখা যায়নি।

দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের স্থানীয় বাসিন্দা নুরু মিয়া বলেন, এ রাস্তার কাজে কোন শ্রমিক ছিলো না। এ বিষয়টি দক্ষিন তারাবুনিয়া ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের মেম্বার মরন আলী মাঝিকে মুঠোফোনে একাধিক বার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি।

দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নের ১নং ওয়ার্ডে দর্জি কান্দি হতে দক্ষিণে জয়নাল মাঝির বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পে ১২ জন শ্রমিককে রাস্তায় মাটি ভরাটের কাজ করতে দেখা যায়। সরকারি ভাবে এ প্রকল্পে ৪২ জন শ্রমিক বরাদ্দ রয়েছে এবং একজন শ্রমিকের পারিশ্রমিক ধরা হয়েছে ২শ টাকা। কিন্তু তারাবুনিয়ায় ২শ টাকায় শ্রমিক পাওয়া যায় না বিধায় চেয়ারম্যান ৩শ টাকা করে শ্রমিক নিয়েছেন।

সরকারিভাবে বরাদ্দকৃত ৪০ জন শ্রমিকের প্রতিদিনের মূল্য আসে ৮ হাজার ৪শ টাকা। সেক্ষেত্রে প্রতি শ্রমিকের পারিশ্রমিক ৩শ টাকা হলে ৮ হাজার ৪শ টাকায় শ্রমিক পাওয়া যায় ২৮জন। দক্ষিণ তারাবুনিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূরুউদ্দিন দরজী ১২ জন শ্রমিক দিয়ে প্রকল্পের কাজ দায়সারা ভাবে সম্পন্ন করেছেন।

এই সুবাদে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল এবং উপ-সহকারী প্রকৌশলী গিয়াস উদ্দিন চেয়ারম্যানের সাথে যোগসাজসে মোটা অংকের টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।

চরসেনসাস ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের বিশ্বরোড হতে মিলন ছৈয়ালের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা থাকার পরও সেখানে নতুন রাস্তা নির্মাণের নামে একটি ভুয়া প্রকল্প দেয়া হয়েছে। আর ২ লাখ টাকা বরাদ্দের বিপরীতে সেখানে কোনো নতুন রাস্তা খুঁজে পাওয়া যায়নি।

এলাকার বাসিন্দা জাহাঙ্গীর মিয়া বলেন, এখানে নতুন কোনো রাস্তা হয়নি। আগের একটি রাস্তা মেরামত করা হয়েছিল। চরসেনসাস ইউনিয়নে অতিদরিদ্রের জন্য কর্মসংস্থান প্রকল্প মানেই ঘাবলা।

এ ব্যাপারে চরসেনসাস ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান জিতু বেপারি বলেন, ৬নং ওয়ার্ডের রাস্তাটি পুনঃনির্মাণ করা হয়েছে। তালিকায় হয়তো ভুলে নির্মাণ লেখা হয়েছে। তাছাড়া অন্যান্য কাজ আমরা নিয়ম অনুযায়ী করছি। এখানে ২শত টাকায় লেবার পাওয়া যায় না। তাই ৩ শত টাকা দিয়ে লেবার নিয়েছি। চিন্তার কোন কারণ নেই। বিল তোলার পর সচিব আপনাদের সাথে দেখা করবে।

এদিকে আরশিনগর ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডে জয়নাল মৃধার বাড়ি থেকে বিশ্বরোড পর্যন্ত রাস্তাটিতে শ্রমিক দিয়ে কাজ না করিয়ে ভ্যাকু মেশিনে করানো হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। রাস্তাটির কাজ এখনও অর্ধেক শেষ হয়নি। অথচ সেখানে প্রায় ১০ দিন ধরে কাজ বন্ধ আছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।

স্থানীয় বাসিন্দা আলম মিয়া বলেন, রাস্তাটি নির্মাণের শুরুতে কয়েক জন শ্রমিক দিয়ে কাজ করানো হলেও পরে ভ্যাকু মেশিন দিয়ে কাজ করানো হয়েছে। অথচ এখানকার দরিদ্র শ্রমিকরা কাজ না পেয়ে অনাহারে অর্ধাহারে দিনাতিপাত করছে। এ বিষয়ে আরশিনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শামসুদ্দোহা রতন বলেন, ৩নং ওয়ার্ডে আমাদের রাস্তার পাশের স্থানীয় এক লোক ভ্যাকু দিয়ে তার ব্যক্তিগত কাজ করিয়েছে। আমাদের কোনো কাজ ভ্যাকু দিয়ে করানো হয়নি। আমাদের প্রতিটি কাজ নিয়ম অনুযায়ী চলছে।

এ বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোস্তফা কামাল বলেন, অতিদরিদ্রের জন্য কর্মসংস্থান প্রকল্পে ভ্যাকু মেশিন দিয়ে কাজ করার কোন সুযোগ নেই। বিষয়টি তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ভেদরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ সাব্বির আহমেদ এর সাথে মুঠোফোনে আলাপ কালে তিনি বলেন, আমার পক্ষে সব ক’টি প্রকল্পে যাওয়া হয়তো সম্ভব হবে না। তারপরেও চেষ্টা করবো প্রতিটি প্রকল্পে যাওয়ার। নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ না হলে কাউকেই বিল দেয়া হবে না। বিল যদি নিতে হয়, তাহলে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করেই নিতে হবে। আর প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কাজে যদি কোন অনিয়ম পাই, তাহলে সেটাও আমি দেখবো। কারণ আমি যেহেতু কোন দুর্নীতি করি না, সেক্ষেত্রে আমার অফিসের কেউ দুর্নীতি করুক এটাও আমি হতে দেবো না।

Total View: 929

    আপনার মন্তব্য





সারাদেশ

কক্সবাজার

কিশোরগঞ্জ

কুড়িগ্রাম

কুমিল্লা

কুষ্টিয়া

খাগড়াছড়ি

খুলনা

গাইবান্ধা

গাজীপুর

গোপালগঞ্জ

চট্টগ্রাম

চাঁদপুর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চুয়াডাঙা

জয়পুরহাট

জামালপুর

ঝালকাঠী

ঝিনাইদহ

টাঙ্গাইল

ঠাকুরগাঁও

ঢাকা

দিনাজপুর

নওগাঁ

নড়াইল

নরসিংদী

নাটোর

নারায়ণগঞ্জ

নীলফামারী

নেত্রকোনা

নোয়াখালী

পঞ্চগড়

পটুয়াখালি

পাবনা

পিরোজপুর

ফরিদপুর

ফেনী

বগুড়া

বরগুনা

বরিশাল

বাগেরহাট

বান্দরবান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ভোলা

ময়মনসিংহ

মাগুরা

মাদারীপুর

মানিকগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জ

মেহেরপুর

মৌলভীবাজার

যশোর

রংপুর

রাঙামাটি

রাজবাড়ী

রাজশাহী

লক্ষ্মীপুর

লালমনিরহাট

শরীয়তপুর

শেরপুর

সাতক্ষীরা

সিরাজগঞ্জ

সিলেট

সুনামগঞ্জ

হবিগঞ্জ

Flag Counter