বৃহস্পতিবার,  ২৪শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,  ৯ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,  দুপুর ২:১৬

ভ্যালেন্টাইন ডে’র আড়ালে হারিয়ে গেছে অগ্নিঝরা ১৪ ফেব্রুয়ারি

ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯ , ১০:০৫

জাকির হোসেন
আজ ১৪ ফেব্রুয়ারি। সামরিক স্বৈরাচারী এরশাদ বিরোধী আন্দোলনের এক অগ্নিঝরা দিন। ১৯৮৩ সালের এইদিনে স্বৈরাচারী এরশাদ সরকারের বিরুদ্ধে সূচিত হয় বড় ধরনের আন্দোলন, যা মধ্য ফেব্রুয়ারির আন্দোলন হিসেবে পরিচিত। সেই থেকে ১৯৯২ সাল পর্যন্ত এদেশের ছাত্র সমাজ দিনটি নানা কর্মসূচির মাধ্যমে স্বৈরাচার বিরোধী ছাত্র প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করে আসছিলো। তবে আন্দোলনের এক দশক পার না-হতেই এ দেশের মানুষের কাছে বিস্মৃত হতে থাকে জয়নাল, জাফর ও দিপালী সাহার নাম।

ভ্যালেন্টাইন ডে বা বিশ্ব ভালোবাসার দিবসের প্রভাবে আড়াল হতে শুরু করে রক্তের অক্ষরে লেখা এক গৌরবময় সংগ্রামের ঐতিহাসিক দিন। ১৯৯৩ সালের দিকে, যায়যায়দিন খ্যাত সাংবাদিক শফিক রেহমানের উদ্যোগে দিনটি পরিণত হয়েছে ভ্যালেনটাইন ডে এবং বহুজাতিক কোম্পানির পণ্য বিক্রির দিন হিসেবে। পাশ্চাত্যের রীতি-নীতিতে ছিলেন অভ্যস্ত শফিক রেহমান।

যুক্তরাজ্য থেকে দেশে ফিরে তিনি এদেশে ভালোবাসা দিবসের প্রচলন করেন। এর একযুগ পর তিনি তার তেজগাঁওয়ের দৈনিক যায়যায়দিন অফিসের সামনের রাস্তাটির নাম দেন ‘লাভ রোড’। ভালোবাসা দিবস নিয়ে অনেক ধরনের মতবিরোধ থাকলেও শেষ পর্যন্ত শফিক রেহমানের চিন্তাটি নতুন প্রজন্মকে বেশি আকর্ষণ করে। সেই সঙ্গে এদেশে প্রেমের একটা নতুন বাজার তৈরি হয়েছে, হাজার হাজার কার্ড, ঘড়ি থেকে হীরে বিক্রি হচ্ছে, মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডাররা এসএমএস থেকে দু’পয়সা তুলছে, টেলিভিশনে এমন একটা ভাব যে ভ্যালেন্টাইন’স ডে-তে দেশে একেবারে ঈদের মতো আমোদ হচ্ছে। ভ্যালেনটাইন ডে-এর প্রভাবে নতুন প্রজন্ম জানতে ও বুঝতে পারছে না ফাল্গুনের এই আগুন ঝরা দিনের সঙ্গে মিশে আছে ১৯৮৩ সালে স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে শহীদ জাফর, জয়নাল, দিপালী সাহার লাল টকটকে রক্ত, আত্মত্যাগের এক সংগ্রামী ইতিহাস।

১৯৮৩ সালের এই দিন মজিদ খানের শিক্ষা-নীতি বাতিল এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ছাত্রদের বিক্ষোভ মিছিলে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র জয়নাল, জাফর, দিপালী সাহাসহ অনেকে। লে. জেনারেল হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলের দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। এরপর প্রায় এক বছর ধরে চলে আন্দোলনের প্রস্তুতি। ১৯৮২ সালে শিক্ষা দিবস (১৭ সেপ্টেম্বর) সামনে রেখে মজিদ খানের শিক্ষা-নীতি বাতিল এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে ১৬ সেপ্টেম্বর মৌন মিছিল করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ, বিপ্লবী ছাত্রমৈত্রী, ছাত্র ইউনিয়ন এবং ছাত্র ঐক্য ফোরামসহ কয়েকটি সংগঠন। এরপর ১৯৮২ সালের ৭ নভেম্বর উপলক্ষে ৮ নভেম্বর বিক্ষোভ মিছিল করে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ। পুলিশ এ মিছিলের ওপর বেপরোয়া হামলা চালায় এবং লাঠিচার্জ করে। ফলে পুলিশের সঙ্গে ছাত্রদের তীব্র সংঘর্ষ বাঁধে এবং এ সংঘর্ষ কয়েক ঘণ্টাব্যাপী চলে। পুলিশ একপর্যায়ে কলা ভবনের ভেতরে ঢুকে ছাত্র এবং শিক্ষকদের ওপর বেপরোয়া হামলা চালায়। এতে অনেক ছাত্র-ছাত্রী এবং কয়েক শিক্ষক আহত হন। এ প্রেক্ষিতে এদিন (৮ নভেম্বর) ছাত্র সংগঠনের মধ্যে ঐক্য আরও দৃঢ় হয় এবং ১৪টি ছাত্র সংগঠনের সমন্বয়ে গঠিত হয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ। ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ গঠিত হওয়ার পর ১৩ ডিসেম্বর এ সংগঠন বিক্ষোভ-সমাবেশ কর্মসূচির ডাক দেয়।

তারই ধারাবাহিকতায় পরবর্তীকালে ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি এরশাদের উপদেষ্টা মজিদ খানের শিক্ষা-নীতি বাতিল এবং সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সচিবালয় ঘেরাও কর্মসূচি দেওয়া হয়। এ কর্মসূচি সফল করতে ছাত্রদের একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল সকাল প্রায় ১১টার দিকে শিক্ষা ভবনের সামনে পৌঁছলে পুলিশ বাধা দেয়। ফলে ছাত্রদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ শুরু হয়। সংঘর্ষের এক পর্যায়ে পুলিশ গুলি চালায়। পুলিশের গুলিতে নিহত হন জয়নাল, জাফর এবং দিপালী সাহাসহ কয়েকজন। নিহতদের কয়েকজনের লাশ গুম করে সরকার। বিকালে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ ঘোষণা এবং বিশ্ববিদ্যালয় এলাকা ও ঢাকা শহরে কারফিউ জারি করা হয়। একই সঙ্গে ওই সময় পুলিশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন ছাত্রাবাসে ঢুকে ছাত্রছাত্রীদের ওপর বেপরোয়া হামলা চালায় এবং ব্যাপক সংখ্যক ছাত্রকে গ্রেফতার করে। ছাত্রহত্যা এবং পুলিশি হামলার প্রদিবাদে পরদিন এ আন্দোলন জাহাঙ্গীর নগর, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে দাবালনের মতো ছড়িয়ে পড়ে। ফলে পরদিন সরকার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং ঢাকা ও চট্টগ্রাম শহরের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বন্ধ ঘোষণা করে। কিন্তু সামরিক স্বৈরাচারী এরশাদের শাসনামলে সংবাদপত্রের ওপর এতই নিষেধাজ্ঞা ছিল যে, এই বিক্ষোভ এবং ছাত্রহত্যার ঘটনার বিষয়ে পরদিন কোনো পত্রিকায় সরকারের প্রেসনোটের বাইরে অন্য কোনো খবর প্রকাশ করতে পারেনি।

রক্তাক্ত ১৪ ফেব্রুয়ারির প্রেক্ষাপট

এইচ এম এরশাদ ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ ক্ষমতা দখলের পর সামরিক শাসন জারির দিনই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা প্রতিবাদ জানিয়ে বিক্ষোভ করেন। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে এদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনে পোস্টার লাগাতে গিয়ে বিপ্লবী ছাত্র মৈত্রীর তিন সদস্য গ্রেফতার হন। এই ছাত্রনেতারা হলেন, শিবলী কাইয়ুম, হাবিবুর রহমান ও আবদুল আলী। পরে সংক্ষিপ্ত সামরিক আদালতে তাদের ৭ বছরের কারাদণ্ড হয়। সেই থেকে শুরু হয় সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে ছাত্রদের আপসহীন লড়াই।

বামপন্থী ছাত্র সংগঠনগুলোর নেতারা ২৬ মার্চের স্বাধীনতা দিবসে সাভারের স্মৃতিসৌধে শ্রদ্ধাঞ্জলি দিতে গিয়ে শহীদ বেদিতেই সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন। মিছিলের খবর শুনে সাভার সেনানিবাস থেকে সেনাবাহিনী চলে আসে, স্মৃতিসৌধে ছাত্রদের ওপর চলে নির্মম নির্যাতন। সরকারি ফরমান ও তৎপরতার কারণে সে সময় সরাসরি রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়লেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দেয়ালে দেয়ালে লাল-কালো অক্ষরে এরশাদের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে দেয়াল লিখন অব্যাহত থাকে। ছাত্রদের দেয়াল লিখন সমানে মুছতে থাকে সামরিক সরকারের তল্পিবাহক পুলিশ বাহিনী। পুলিশ যত দেয়াল সাদা চুন দিয়ে মুছে ফেলে, ছাত্ররা ততই দেয়াল লিখন চালিয়ে যেতে থাকে। এভাবেই সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে চলছিল দীর্ঘমেয়াদি সংগ্রামের প্রাথমিক প্রস্তুতি। এ সময় ছাত্রনেতারা একটি সর্বাত্মক গণতান্ত্রিক ছাত্র আন্দোলনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করছিলেন। এ প্রেক্ষিতে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে বিবৃতি প্রদান করে। সেটাই ছিল সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম লিখিত প্রতিবাদ।

লেখক : সাংবাদিক

Total View: 454

    আপনার মন্তব্য





সারাদেশ

কক্সবাজার

কিশোরগঞ্জ

কুড়িগ্রাম

কুমিল্লা

কুষ্টিয়া

খাগড়াছড়ি

খুলনা

গাইবান্ধা

গাজীপুর

গোপালগঞ্জ

চট্টগ্রাম

চাঁদপুর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চুয়াডাঙা

জয়পুরহাট

জামালপুর

ঝালকাঠী

ঝিনাইদহ

টাঙ্গাইল

ঠাকুরগাঁও

ঢাকা

দিনাজপুর

নওগাঁ

নড়াইল

নরসিংদী

নাটোর

নারায়ণগঞ্জ

নীলফামারী

নেত্রকোনা

নোয়াখালী

পঞ্চগড়

পটুয়াখালি

পাবনা

পিরোজপুর

ফরিদপুর

ফেনী

বগুড়া

বরগুনা

বরিশাল

বাগেরহাট

বান্দরবান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ভোলা

ময়মনসিংহ

মাগুরা

মাদারীপুর

মানিকগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জ

মেহেরপুর

মৌলভীবাজার

যশোর

রংপুর

রাঙামাটি

রাজবাড়ী

রাজশাহী

লক্ষ্মীপুর

লালমনিরহাট

শরীয়তপুর

শেরপুর

সাতক্ষীরা

সিরাজগঞ্জ

সিলেট

সুনামগঞ্জ

হবিগঞ্জ

Flag Counter