বৃহস্পতিবার,  ২২শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,  ৬ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,  রাত ৯:৩৪

মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ডাঃ আবুল কাশেম

মার্চ ৭, ২০১৮ , ০৮:১২

জাহাঙ্গীর কবির
মহান মুক্তিযুদ্ধে যে কয়জন সংগঠক ছিলেন তাদের মধ্যে ডাঃ আবুল কাশেম ছিলেন অন্যতম। তিনি একাধারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের রাজনৈতিক সহকর্মী, চিকিৎসক এবং সাংবাদিক ছিলেন। তিনি ১৯২২ সালে শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার ফতেজঙ্গপুর ইউনিয়নের বাজন পাড়া গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম রিয়াজ উদ্দিন বেপারী। তারা তিন ভাই ছিলেন। তার স্ত্রীর নাম পারুল বেগম।
তাদের তিন ভাইয়ের মধ্যে ডাঃ আবুল কাশেম ছিলেন মেঝো। বড় ভাই আবুল হোসেন ছিলেন বাংলাদেশ রেলওয়ের সাবেক প্রধান প্রকৌশলী। আবুল হোসেনের পুত্র বধু অ্যাডভোকেট তাহমিনা সুলতানা ঢাকা মহানগর দক্ষিণ আওয়ামীললীগের মহিলা বিষয়ক সম্পাদিকা।
আর ছোট ভাই আবুল হাসেম মিয়া চট্টগ্রাম স্থানীয় সরকার বিভাগের উপ-পরিচালক, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক, সাব ডিভিশনাল অফিসার ও বিভিন্ন জেলার ম্যাজিস্ট্রেট সহ সরকারী বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
পারুল বেগম হচ্ছেন মরহুম ডাঃ আবুল কাশেমের সহধর্মিনী। তিনি ছিলেন একজন ‘রত্নগর্ভা মা’। মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা ছিল অপরিসীম। তার চোখের সামনেই মরহুম ডাঃ আবুল কাশেমের ঘড়টি পুড়িয়ে দিয়েছিল পাকিস্তানি আর্মি ও এদেশীয় রাজাকারেরা। নিজের জীবনের মায়া ত্যাগ করে শত বাঁধা-বিপত্তি থাকা সত্ত্বেও, নিজের বাড়ি ছেড়ে কোথাও যাননি। মুক্তিযুদ্ধে অসীম সাহসিকতা ও বীরত্বের জন্য তাকে ‘বীরের মর্যাদা’ দেয়া উচিত ছিলো। কিন্তু দেয়া হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি নিয়ে আজও তিনি আমাদের মাঝে বেঁচে আছেন।
ডাঃ আবুল কাশেম ১৯৪৪ সালে বিঝারী উপসী তারা প্রসন্ন উচ্চ বিদ্যালয় হতে ম্যাট্রিক পাস করেন। প্রথমে কলিকাতা তারপর ঢাকার মিটফোর্ড মেডিকেল স্কুল থেকে ১৯৫০ সালে এল.এম.এফ ডিগ্রি অর্জন করেন। মেডিকেল স্কুলে অধ্যয়নরত অবস্থায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সান্নিধ্য লাভ করেন। ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত ছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনে বিভিন্ন সভা এবং মিছিলে অংশগ্রহণ করেছেন।
তিনি প্রথমে সরকারী চাকরী করতেন। আওয়ামীলীগের রাজনীতির সাথে সম্পৃক্ত হবার কারণে তাকে শাস্তি মুলক বদলি করা হয়। ১৯৫৮ সালে সরকারী চাকরী ত্যাগ করে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন। পরে মাদারীপুর শহরে চিকিৎসা সেবা শুরু করেন।
রাজনীতিবিদ, চিকিৎসক এবং সাংবাদিক এই তিনটি ক্ষেত্রেই তিনি সাফল্য পেয়েছিলেন এবং নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। অমায়িক ব্যবহার, দেশপ্রেম ও কর্তব্যনিষ্ঠা পরিশ্রম আর সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালনই ছিল তাহার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য। আর এ কারণেই তিনি অত্যন্ত জনপ্রিয় ব্যক্তি হিসেবে সকলের শ্রদ্ধা অর্জন করতে সমর্থ হয়েছিলেন। তিনি সাধারণ মানুষকে বিনা অর্থে চিকিৎসা সেবা দিতেন। নির্লোভ এ ব্যক্তিটি জীবনে যা কিছু উপার্জন করেছেন তা ব্যয় করেছেন সংগঠন ও সেবামূলক কাজে।
১৯৬৬ সালে লোনসিং এলাকাতে ভয়াবহ টর্নেডো হলে নিজের বাড়িতে হাসপাতাল স্থাপন করে আহতদের চিকিৎসা সেবা এবং আশ্রয় দান করেন। ওই সময় পূর্ব পাকিস্তানের গভর্ণর মোনায়েম খান তার বাড়ি পরিদর্শনে এলে ডাঃ আবুল কাশেম তার সাথে বাকবিতন্ডায় লিপ্ত হন। ১৯৬৭ সালে তিনি নড়িয়ার বিভিন্ন এলাকায় ভয়াবহ টর্নেডোতে ক্ষতিগ্রস্থ লোকদের মাঝে ত্রানের ব্যবস্থা করেন। ১৯৭০ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী হিসেবে পালং, নড়িয়া ও জাজিরা থেকে এম এন এ নির্বাচিত হন।
১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক ছিলেন। তিনি মুজিবনগর সরকারের একজন নিবেদিত প্রাণ নেতা ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে মুক্তিযুদ্ধাদের তালিকাভুক্ত করা, তাদের ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করা এবং যুদ্ধের সরঞ্জাম সরবরাহের ক্ষেত্রে তিনি অবিস্মরণীয় ভূমিকা পালন করেছেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে দেশের মাটিতে থেকে তিনি মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করেন। আক্কাস প্রধান সুবেদার জয়নাল আবেদীনের সাথে আহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসা প্রদান করেন। পালং থানা অপারেশনের সময় শহীদ তাহেরকে চিকিৎসা দান করেন।
১৯৭১ সালে ২২শে মে ভোরে ফজরের আজানের একটু পর ডাঃ আবুল কাশেমের বাজন পাড়ার বাড়িতে আনুমানিক ৬০ জন মিলিটারী এবং রাজাকাররা বাড়িটি ঘেরাও করে রাখে। তখন বাড়িতে ডাঃ আবুল কাশেমের স্ত্রী পারুল বেগম, তার চার ছেলে এবং কয়েকজন নিকট আত্মীয় ছিলেন। মিলিটারীরা ঘরে আগুন ধরিয়ে দিলে, ঘরটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। স্বাধীনতার এতো বছর পরেও বাড়িটি সংরক্ষন করা হয়নি। এখনো বাড়িটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে।
ডাঃ আবুল কাশেম শরীয়তপুর এবং মাদারীপুরের অত্যন্ত আকর্ষণীয় ব্যক্তি ছিলেন। ১৯৭৩ সালে সাংসদ নুরুল হক হাওলাদারের মৃত্যুর পর উপ-নির্বাচনে নড়িয়া হতে বিপুল ভোটে এম.পি নির্বাচিত হন। তাহার মেয়াদকাল ছিল ১৯৭৩-১৯৭৫ সাল পর্যন্ত।
ডাঃ আবুল কাশেম তৎকালীন সময়ে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। নিন্মে তা দেয়া হলো ঃ সভাপতি-শরীয়তপুর জেলা আওয়ামীলীগ, সহ-সভাপতি মাদারীপুর জেলা আওয়াামীলীগ, বেসামরিক প্রশাসক-পূর্ব মাদারীপুর (স্বাধীনতা পরবর্তী কাল), চেয়ারম্যান- রেড ক্রস সোসাইটি মাদারীপুর মহকুমা (স্বাধীনতা পরবর্তী কাল), সভাপতি-গভর্নিং বডি সরকারী নাজিমুদ্দিন কলেজ, মাদারীপুর, সভাপতি- বিঝারী উপসী তারা প্রসন্ন উচ্চ বিদ্যালয়, নড়িয়া, শরীয়তপুর এবং সভাপতি- গভর্নিং কাউন্সিল নড়িয়া সরকারী কলেজ, নড়িয়া শরীয়তপুর।
একজন প্রতিথযশা সাংবাদিক হিসেবে ডাঃ আবুল কাশেমের অনেক সুনাম ছিল। তিনি দৈনিক সংবাদ, দৈনিক ইত্তেফাক এবং আজাদ পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন। তিনি সাংবাদিকদের প্রাণের স্পন্দন মাদারীপুর প্রেসক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ছিলেন।
ডাঃ আবুল কাশেম অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। অর্থ বিত্তের প্রতি তার কোনো লোভ লালসা ছিল না। গরীব দুঃখী জনগণের সেবা করাই ছিল তাহার প্রধান কাজ। শুধু মাদারীপুর শহরে একটি বসত বাড়ি ছাড়া তার কোনো সম্পত্তি ছিল না। বাড়িটি তিনি বহু কষ্ট করে কিনেছিলেন। মৃত্যুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত তিনি কোন ব্যাংক ব্যালেন্স রেখে যেতে পারেননি।
১৯৮৬ সালে মাদারীপুর শহরের নিজ বাসভবনে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর পর তাকে মাদারীপুর শহরেই সমাহিত করা হয়।
ডাঃ আবুল কাশেম আজ আমাদের মাঝে নেই। তিনি ছিলেন একজন আদর্শ রাজনীতিবিদ। একজন খাঁটি দেশপ্রেমিক। একজন শীর্ষস্থানীয় সমাজসেবক এবং নিষ্টাবান চিকিৎসক। স্বাধীনতার এতো বছর পরেও তাহার নামে সরকারীভাবে কোনো রাস্তাঘাট কিংবা প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়নি। এমনকি কোন পদকেও তাকে ভূষিত করা হয়নি। তাই সরকারী ভাবে তাহার নামে কোন প্রতিষ্ঠানের নামকরণসহ ‘মরণোত্তর স্বাধীনতা’ পদকে ভূষিত করা হোক।

Total View: 1092

    আপনার মন্তব্য





সারাদেশ

কক্সবাজার

কিশোরগঞ্জ

কুড়িগ্রাম

কুমিল্লা

কুষ্টিয়া

খাগড়াছড়ি

খুলনা

গাইবান্ধা

গাজীপুর

গোপালগঞ্জ

চট্টগ্রাম

চাঁদপুর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চুয়াডাঙা

জয়পুরহাট

জামালপুর

ঝালকাঠী

ঝিনাইদহ

টাঙ্গাইল

ঠাকুরগাঁও

ঢাকা

দিনাজপুর

নওগাঁ

নড়াইল

নরসিংদী

নাটোর

নারায়ণগঞ্জ

নীলফামারী

নেত্রকোনা

নোয়াখালী

পঞ্চগড়

পটুয়াখালি

পাবনা

পিরোজপুর

ফরিদপুর

ফেনী

বগুড়া

বরগুনা

বরিশাল

বাগেরহাট

বান্দরবান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ভোলা

ময়মনসিংহ

মাগুরা

মাদারীপুর

মানিকগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জ

মেহেরপুর

মৌলভীবাজার

যশোর

রংপুর

রাঙামাটি

রাজবাড়ী

রাজশাহী

লক্ষ্মীপুর

লালমনিরহাট

শরীয়তপুর

শেরপুর

সাতক্ষীরা

সিরাজগঞ্জ

সিলেট

সুনামগঞ্জ

হবিগঞ্জ

Flag Counter