শুক্রবার,  ২৫শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,  ১০ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,  সকাল ১০:১৪

শরীয়তপুরের ভোজেশ্বর থেকে ঢাকা যাওয়ার বিড়ম্বনা

ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০১৯ , ০৯:৪৩

_ কবির সরদার

সাল ১৯৭৭। আমি ক্লাস সেভেেনের ছাত্র। যতদুর মনে পরে বৈশাখ মাস। স্কুল বন্ধ। তাছাড়া আমি তেমন নিয়মিত ছাত্র ছিলাম না। তাই স্কুল কামাই দিয়ে যাওয়াটাও আমার জন্য কোন ব্যাপার ছিল না। ঢাকা বেড়াতে যাওয়ার কথা শুনে খুবই আনন্দিত হলাম। পাশের ঘরের আমার এক চাচা ঢাকা যাবে। তার সাথে আমার দাদু আমাকে ঢাকা পাঠাবে। দাদুর নাতনি মানে আমার বড় বোনের বাসায় কিছু কাঁচা আম পাঠাবে। আমারও বেড়ানোর সখ। তাই সানন্দে তৈরি হয়ে গেলাম।

তখন আমাদের ভোজেশ্বর থেকে ঢাকা যাওয়ার একমাত্র উপায় ছিল লঞ্চ। আর এই লঞ্চ যখন তখন পাওয়া যেত না। শুধু সকালে একটি ও রাতে একটি। চাচা আবার রাতের লঞ্চে যাওয়া পছন্দ করত। কারণ পরের দিন পুরো কর্ম দিবস পাওয়া যাবে। বর্ষাকাল ছাড়া ভোজেশ্বরের কীর্তিনাশা নদীতে লঞ্চ ঢুকে না। তাই আমাদের পদ্মার পাড়ের ওয়াপদা ঘাটে গিয়ে লঞ্চ ধরতে হবে। অনেক দূরের পথ। তাই বিকাল ৪ টার দিকে রওয়ানা দিলাম।

আমার দাদু আমার কাঁধে যে কাঁচা আমের বোঝা দিয়েছে তা মনে হয় ৮-১০ সের হবে। আমি ছোট মানুষ তাই নাকি কম দিয়েছে। যা হোক যথারীতি চাচার পিছু পিছু রওয়ানা দিলাম। তখান ভোজেশ্বর থেকে ওয়াপদা নৌকা অথবা রিকশায় চরে যেতে হতো। ওয়াপদা থেকে সেই ভাঙ্গাচুরা ডুবো ডুবো কাঠবডির লেঞ্চে চরে ঢাকা।
নৌকায় বেশী সময় লাগবে বিধায় আমরা ভোজেশ্বর বাজারের উত্তর মাথায় গেলাম রিকশায় করে বাঁশতলা যাওয়ার জন্য। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে ওয়াপদা ঘাট। এদিকে লঞ্চের সময় আবার সন্ধ্যা সারে সাতটায়। তার পূর্বেই আমাদের ওয়াপদা পৌঁছাতে হবে। কিন্তু কোন রিকশার দেখা পাচ্ছি না। কেউ কেউ বলল মাঝে মাঝে নড়িয়া থেকে দু একটা রিকশা আসে। গত তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে রাস্তা খুবই খারাপ। তাই আজকে তেমন রিকশা নেই।

কিছুক্ষণ পর দুটো রিকশা এল । রিকশার চাকা তিনটি এতই মোটা মনে হয় মটর সাইকেলের চাকা। গত বেশ কিছুদিনের বৃষ্টিতে ভোজেশ্বর থেকে বাঁশতলা পর্যন্ত রাস্তার জায়গায় জায়গায় কাদা। আর এ কাদায় জড়িয়ে রিকশার চাকা মোটা হয়ে গিয়েছে। এই সমস্যার কারণে কিছুদিন যাবত রিকশাও কম বের হয়।

যাহোক চাচা রিকশা ভাড়ার দরদাম করা আরম্ভ করল। জনপ্রতি ৫-৬ টাকার ভাড়া কর্দমাক্ত রাস্তার কারণে রিকশাওয়অলা ১০ টাকার কমে যাবে না। তারা ১ টাকা পর্যন্ত কমাল। কিন্তু চাচা ৬ টাকার বেশী দিবে না। অগত্যা আমাদের পায়ে হেঁটেই রওয়ানা দিতে হল। আমের বোঝা নিয়ে ভোজেশ্বর বাজার পর্যন্ত আসতেই আমার নাভিশ্বাস। এখন এ বোঝা নিয়ে যেতে হবে ওয়াপদা। তখন দূরত্ব সম্বন্ধে আমার তেমন ধারণা ছিল না। মনে করে ছিলাম বাড়ি থেকে ভোজেশ্বর বাজার যতদূর তার চেয়ে একটু বেশী হবে হয়ত। কিন্তু আমি যে এ বোঝা নিয়ে কর্দমাক্ত দূর্গম পথ পাড়ি দিতে যাচ্ছি এবং আমার মত এক শিশুর যে কত কষ্ট হবে তা আমার প্রতিবেশী চাচা ঘুনাক্ষরেও বুঝতে পারল না। সে ৩ টাকা বাঁচানোর জন্য পায়ে হাঁটাকেই অগ্রাধিকার দিল। ৮-১০ সেরের বোঝা কখনো হাতে কখনো মাথায় আবার কখনো কাঁধে নিয়ে কর্দমাক্ত রাস্তায় হাঁটছিতো হাঁটছিই। এ রাস্তা মনে হয় শেষ হওয়ার নয়। মাঝে মাঝে কাদায় হাঁটার গতি শ্লথ হয়ে আসে। আমার ঢাকা যাওয়ার আনন্দের কথা মনে করে নব উদ্যোমে হাঁটা আরম্ভ করি।

একটু পরে দেখলাম নতুন বিপদ ঘনিয়ে আসছে। উত্তর পশ্চিম কোনে মেঘের ঘনঘটা। দেখতে না দেখতেই কাল বৈশাখীর দমকা হাওয়া বইতে লাগল। আমরা সবে মাত্র হয়ত মাদবর বাজার এলাকা ছাড়িয়েছি। এবার নামল বৃষ্টি। রাস্তার পাশেই একটা কুঁড়ে ঘরে আশ্রয় নিলাম। এটা ছিল তিন দিকে পাটখড়ির বেড়া দেওয়া একটা খোলা ঘর। বাড়ীর লোকজনের মূল ঘর আলাদা। বাতাসের ঝাপটায় আমরা ভিঁজে যাচ্ছিলাম। ঘরেরও নড়বড়ে অবস্থা। পাশের ঘর থেকে বাড়ীর গেরস্থেরা আমাদেরকে তাদের ঘরে যেতে বলল। কিন্তু আমরা সঙ্কোচ বোধ করে এখানেই রয়ে গেলাম।

ধীরে ধীরে বাতাস কমে এল । সেই সাথে বৃষ্টি। ততক্ষণে আমরা প্রায় অর্ধ ভেঁজা হয়ে গেছি। এদিকে অনেক সময় পেরিয়ে গেছে। লঞ্চ ধরার জন্য দ্রুত হাাঁটতে হবে। রাস্তার যে সব কিনারা শুকনো ছিল তা এবার পিচ্ছিল হেয়েছে। হাঁটতে আরও কষ্ট হচ্ছে। আমি বোঝা নিয়ে কতক্ষণ পরপরই চাচার থেকে পিছিয়ে পরছি।
দু একবার ধপাস পরেছি কিনা মনে নেই। আর পরে থাকলেও এখানে বলব না।

এভাবে হাঁটতে হাঁটতে নড়িয়া বাজার পেরিয়ে বাঁশতলা পার হলাম। প্রায় অন্ধকার নেমে গেছে। এখন রাস্তা ভাল। এখানে বালু। তাই কোন কাদা নেই। চাচা বলছে দ্রুত পায়ে হাঁটতে। না হলে লঞ্চ পাব না। মনে হয় আমার জীবনী শক্তির শেষটুকু দিয়ে বোঝা নিয়ে চাচার পিছু পিছু দৌড়াচ্ছি। ঢাকা বেড়াতে যাওয়ার যে এত ভোগান্তি তখন কিন্তু আমি বুঝতে পারিনি। তখন আমার অবস্থা ছিল প্রায় এখনকার রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিশুদের মত। এই আবছা অন্ধকারে যে করেই হোক আমাকে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পৌঁছাতেই হবে ওয়াপদা ঘাট। মনে হয় সেখানেই অপেক্ষা করছে আমার জন্য পরম শান্তি।

একটু পরেই লঞ্চের বাতি দেখতে পেলাম। এই কষ্টের ভিতরও মনটা যেন ফুরফুরে হয়ে উঠল। চাচার পিছু পিছু প্রায় দৌড়াচ্ছি। লঞ্চের হুইসেলের শব্দ পাচ্ছি। মনে হয় ছেড়ে যাচ্ছে। শরীরের যতটুকু বল ছিল সেটুকু দিয়ে প্রাণ পনে দৌড়াচ্ছি। লঞ্চের মুভমেন্ট লক্ষ্য করছি। মনে হয় ছেড়ে দিয়েছে। না আর পারলাম না। বিষাদে ভেঙ্গে গেল হৃদয়। প্রায় ২০০ গজ দূরে বালুর মধ্যে বসে পরলাম। পূবাকাশে বড় একটা চাঁদ উঠেছে। হতাশা নিয়ে চাদের দিকে তাকিয়ে রইলাম! চাচা আমাকে বলতে লাগল আমার দোষেই নাকি লঞ্চ ফেল করেছি!

রচনা কালঃ ১০ ফেব্রুয়ারী ২০১৯

Total View: 487

    আপনার মন্তব্য





সারাদেশ

কক্সবাজার

কিশোরগঞ্জ

কুড়িগ্রাম

কুমিল্লা

কুষ্টিয়া

খাগড়াছড়ি

খুলনা

গাইবান্ধা

গাজীপুর

গোপালগঞ্জ

চট্টগ্রাম

চাঁদপুর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চুয়াডাঙা

জয়পুরহাট

জামালপুর

ঝালকাঠী

ঝিনাইদহ

টাঙ্গাইল

ঠাকুরগাঁও

ঢাকা

দিনাজপুর

নওগাঁ

নড়াইল

নরসিংদী

নাটোর

নারায়ণগঞ্জ

নীলফামারী

নেত্রকোনা

নোয়াখালী

পঞ্চগড়

পটুয়াখালি

পাবনা

পিরোজপুর

ফরিদপুর

ফেনী

বগুড়া

বরগুনা

বরিশাল

বাগেরহাট

বান্দরবান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ভোলা

ময়মনসিংহ

মাগুরা

মাদারীপুর

মানিকগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জ

মেহেরপুর

মৌলভীবাজার

যশোর

রংপুর

রাঙামাটি

রাজবাড়ী

রাজশাহী

লক্ষ্মীপুর

লালমনিরহাট

শরীয়তপুর

শেরপুর

সাতক্ষীরা

সিরাজগঞ্জ

সিলেট

সুনামগঞ্জ

হবিগঞ্জ

Flag Counter