শনিবার,  ১৯শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,  ৪ঠা আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,  রাত ৮:৩৪

শরীয়তপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ

জুলাই ২৮, ২০১৮ , ০১:৩৭

স্টাফ রিপোর্টার
শরীয়তপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জিয়াউর রহমানের বিরুদ্ধে মাননীয় প্রধান মন্ত্রীর দরিদ্র বান্ধব কর্মসূচির আওতায় গৃহহীনদের জন্য ঘর নির্মাণ প্রকল্পে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটিকে পাশ কাটিয়ে, তার ইচ্ছে মতো মনগড়া নিয়মে প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করছেন। শুধু তাই নয়, সরকারী বিধি মোতাবেক প্রকল্পের নির্মাণ কাজ ঠিকাদার বিহীন স্থানীয় শ্রমিক দিয়ে করার কথা থাকলেও তিনি স্থানীয় শ্রমিক নিয়োগ না দিয়ে অন্য জেলার ঠিকাদার দিয়ে কাজ করাচ্ছেন। আর এই সুবাদে তিনি হাতিয়ে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। এ বিষয়ে যদি কেউ তথ্য সংগ্রহ করতে যায় তাহলে তাকে গুলি করে হত্যা করবেন বলে হুমকি দিতেও পিছ পা হচ্ছেন না তিনি।

শরীয়তপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, “যার জমি আছে ঘর নেই, তার নিজ বাড়িতে গৃহ নির্মাণ” এই শ্লোগানকে সামনে রেখে মাননীয় প্রধান মন্ত্রী তার নিজস্ব পরিকল্পনা থেকে দরিদ্র বান্ধব কর্মসূচির আওতায় আশ্রয়ণ-২ প্রকল্প নামে একটি প্রকল্প চালু করেছেন। সেই প্রকল্পের আওতায় শরীয়তপুর সদর উপজেলার ১০টি ইউনিয়নে ৪শ ৯৫টি গৃহহীন হতোদরিদ্র পরিবারকে প্রায় ৫ কোটি টাকা ব্যায়ে ঘর নির্মাণ করে দেয়া হচ্ছে।
সরকারী বিধি মোতাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সভাপতি, প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা সদস্য সচিব, সহকারি কমিশনার ভূমি সদস্য, উপজেলা প্রকৌশলী সদস্য এবং সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে সদস্য করে ৫ সদস্য বিশিষ্ট একটি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটি গঠন করবেন। সেই কমিটির মাধ্যমে ঘর গুলো নির্মাণ করা হবে। আর এ কাজকে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সরাসরি তদারকি করা হবে।

২০১৮ সালের মে মাসে শুরু হয় উল্লেখিত প্রকল্পের কাজ। ৩০ জুনের মধ্যে শেষ করার কথা। প্রকল্পের সময় উত্তীর্ণ হয়ে গেলেও শরীয়তপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির কোন সদস্যকে কোন কিছু না জানিয়ে মাগুরা জেলা থেকে ঠিকাদার এনে দায় সাড়া ভাবে বাস্তবায়ন করছে ৫শ ঘর নির্মাণের কাজ।

সরকারী বিধি মোতাবেক এই প্রকল্পের যাবতীয় খরচ মেটানোর জন্য সভাপতি এবং সদস্য সচিব যৌথ স্বাক্ষরে একটি ব্যাংক হিসাব খুলবেন। সে অনুযায়ী শরীয়তপুর রূপালী ব্যাংকে একটি যৌথ হিসাব খোলা হয়। যার নাম্বার হচ্ছে ১২০৮। উক্ত ব্যাংক হিসাব থেকে ৮১ লক্ষ টাকা উত্তোলন করা হয় ঘর নির্মাণের উপকরণ কেনার জন্য।

কিছুদিন পর প্রকল্পের টাকা আত্মসাতের উদ্দেশ্যে সদস্য সচিব প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা নুরুন্নাহারের কাছ থেকে ব্যাংক চেকের স্বাক্ষর ক্ষমতা নিয়ে নেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা জিয়াউর রহমান।

জানা গেছে, সাড়ে ১৬ ফিট দৈর্ঘ্য, ১০ ফিট প্রস্থ একেকটি ঘরের সাথে ৫ ফিট প্রস্থের একটি বারান্দা দেয়া হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় একটি টয়লেট রয়েছে এবং ঘরের ভিটি পাকা করে দেয়ার বিধান রয়েছে। কিন্তু সরেজমিন গিয়ে দেখা গেছে ব্যাপক অনিয়মের চিত্র। প্রতিটি ঘরের নির্মাণ ব্যায় সরকার ১ লক্ষ টাকা নির্ধারণ করলেও নিন্ম মানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ব্যায়ে নির্মাণ কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। গৃহ নির্মাণের উপকরণ অত্যন্ত নিন্মমানের হওয়ায় অনেক উপকোরভোগী ফিরিয়ে দিচ্ছেন ঠিকাদারের দেয়া কাঠ ও ঘরের খুঁটি। নিয়ম বহির্ভূত ভাবে দরিদ্র লোকদের খরচে ঘরের ভিটি বাঁধিয়ে নিচ্ছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিয়োগপ্রাপ্ত ঠিকাদার। এমনকি এই হতোদরিদ্র লোকদের কাছ থেকে থাকা খাওয়ার টাকাও আদায় করে নিচ্ছে তারা। গৃহ নির্মাণের উপকরণ পৌছানোর খরচ সরকারী ভাবে বহন করার কথা থাকলেও তা আদায় করা হচ্ছে উপকারভোগীদের কাছ থেকে।

প্রকল্পের প্রাক্কোলন অনুযায়ী প্রতিটি ঘরে কংক্রিটের তৈরী ৪ ইঞ্চি বাই ৪ ইঞ্চি ব্যাসার্ধের ১২ ফিট দৈর্ঘ্যরে ১২ টি খুঁটি থাকবে মুল ঘরে। প্রতিটি খুঁটি তৈরী করতে হবে ২ সুতা আকারের ১২ ফিট লম্বা ৪টি করে রড এবং প্রতি ফুটে একটি করে রিং দিয়ে। অর্থাৎ ১২টি করে রিং থাকার কথা প্রতিটি খুঁটিতে। কিন্তু প্রাক্কলন অনুসরণ না করে ঠিকাদারের লোকেরা প্রতিটি খুটি তৈরী করছে সাড়ে ১০ থেকে ১১ ফিট লম্বা করে এবং তাতে ১২টি রিংয়ের পরিবর্তে দিচ্ছে ৬ টি রিং। বারান্দা এবং শৌচাগারের খুটির সাইজ ১০ ফিট লম্বায় ১০টি করে রিং দেয়ার কথা থাকলেও খুটি তৈরী করা হচ্ছে ৯ ফিট এবং রিং দেয়া হচ্ছে ৫টি করে। শুধু তাই নয়, মূল ঘর নির্মাণে নাট, বোল্টু, স্ক্রু ব্যবহারের কথা থাকলেও সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে ক্ষতিকর পেরাগ। ২৪ হাজার ৫শ টাকার কাঠ প্রতিটি ঘরে ব্যবহারের কথা থাকলেও দেয়া হচ্ছে মাত্র ৫-৬ হাজার টাকার কাঠ। ২ হাজার ১শ টাকা ব্যায়ে চারটি জানালায় লোহার গ্রীল দেয়ার কথা থাকলেও দিচ্ছে মাত্র দেড় শত টাকার প্লাষ্টিক পাইপ। প্রতিটি ঘরে একটি দরজা ও চারটি জানালার ব্যায় ৭ হাজার টাকা নির্ধারণ করা থাকলেও একজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে নিন্মমানের চারটি জানালা ও একটি দরজা ক্রয় করা হচ্ছে মাত্র ২ হাজার ১শ টাকায়। প্রতিটি ঘর নির্মাণে ৪১ হাজার টাকা ব্যায়ে বিভিন্ন আকারের ৪২টি ঢেউ টিন ব্যবহার করার বিধান থাকলেও টিনগুলো ক্রয় করা হচ্ছে মাত্র ২১ হাজার ২ শত ৫০ টাকা দিয়ে। গৃহ নির্মাণের উপকরণ তৈরী এবং ক্রয় পদ্ধতিতে এমন অনিয়মের কথা জানিয়েছেন খোদ নির্মাণ শ্রমিক, ব্যবসায়ী এবং উপকারভোগীরা।

হতোদরিদ্র মকবুল হোসেন হোসেন সরদার বলেন, আমার বসবাসের ভালো ঘর না থাকায় সরকার আমাকে একটি ঘর নির্মাণ করে দেয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। ঠিকাদারের লোকেরা আমার বাড়িতে ঘর তোলার জন্য যে সকল কাঠ ও খুঁটি এনেছে তা দিয়ে ঘর নির্মাণ করলে বেশিদিন টিকবে না। ছেলে মেয়ে নিয়ে এই ঘরে নিচে পরেই আমাদের মরতে হবে। আমরা গরীব হলেও এতো সস্তা কাঠ দিয়ে রান্না ঘরও নির্মাণ করি না। আমি মিস্ত্রিদের ফেরৎ পাঠিয়েছি। যদি ভাল কাঠ না দেয়, তাহলে এই ঘর আমি ফেরৎ দেব।

প্রকল্পের উপকারভোগী হতোদরিদ্র মমতাজ বেগম বলেন, আমি ২ হাজার টাকা খরচ করে ঘরের ভিটা বাঁধাই করেছি। ছয় জন মিস্ত্রিকে আমার খরচেই খাওয়া দাওয়া করিয়েছি। তবে, যে সকল কাঠ দিয়ে ঘর বানানো হচ্ছে তা খুবই নিন্মমানের।

রাজ মিস্ত্রি আমির হোসেন বলেন, শরীয়তপুরের ইউএনও স্যার আমাকে মৌখিক ভাবে কাজের চুক্তি দিয়েছে। আমি ঘরের খুটি তৈরী করি ১১ ফুট লম্বা আর বারান্দার খুটি ৯ ফুট লম্বা। মাগুরা জেলা রাজ মিস্ত্রি সালাউদ্দিন ও ইয়াসিন মিয়া বলেন, ইউএনও স্যার তার ম্যানেজারের মাধ্যমে আমাদের কাছে মালামাল পাঠান। আমরা বড় খুটিতে ৭টা রিং এবং ছোট খুটিতে ৬টা করে রিং ব্যবহার করছি।

মাগুরা থেকে আগত কাঠ মিস্ত্রি গৌতম চন্দ্র বলেন, প্রতিটি ঘর নির্মাণের জন্য ঠিকাদার খায়রুল আলম আমাকে সাড়ে ৪ হাজার টাকা মুজুরী দেয়। আমি আমার লোকদের নিয়ে ঘর তুলে দেই। এভাবে ২শ ঘর তৈরীর চুক্তি নিয়েছি।

স্থানীয় ব্যবসায়ী মাওলানা ওমর ফারুখ বলেন, আমার কাছ থেকে প্রতিটি ঘরের জন্য একটি দরজা ও চারটি জানালা ক্রয় করেছেন ইউএনও সাহেবের লোকেরা। প্রতিটি দরজা ৯শ টাকা এবং প্রতিটি জানালা ৩শ টাকা দরে বিক্রি করছি। মোট ৫ পিচ বিক্রি করছি ২১ শত টাকায়।

রুদ্রকর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাবিবুর রহমান ঢালী বলেন, আমার ইউনিয়নে প্রায় ৫০টি ঘর নির্মাণের কাজ চলছে। আমি শুনেছি প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির আমি একজন সদস্য। কিন্তু আমাকে এ বিষয়ে কিছুই অবগত করানো হয়নি। কাকে দিয়ে, কি ভাবে ঘর নির্মাণের কাজ করানো হচ্ছে তাও জানি না। তবে শুনেছি, ঘর নির্মাণে যে সমস্ত উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে তা মানসম্মত নয়।

সদর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা মোসাম্মাৎ নুরুন্নাহার বলেন, সরকারী বিধি মোতাবেক আমি এই প্রকল্পের সদস্য সচিব হলেও আমাকে কোন দায়িত্ব দেয়া হয়নি। মাগুরা জেলা থেকে কিছু লোক এসে প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করছে তা আমি শুনেছি। এই প্রকল্পের টাকা খরচের জন্য ইউএনও স্যার এবং আমার নামে ব্যাংকে একটা যৌথ হিসাব নাম্বার ছিল। আমি কয়েক দিন আগে ইউএনও স্যারকে একক দায়িত্ব দিয়ে সেখান থেকে সরে এসেছি।

শরীয়তপুর সদর উপজেলা প্রকৌশলী আ.ফ.ম তৈয়বুর রহমান বলেন, আমি যে এই কমিটির একজন সদস্য তা আমি নিজেই জানি না। ইউএনও স্যার আমাকে কখনো জানায়নি। কোন মিটিং হয়েছে বলেও জানি না। এমনকি আমাকে কোন চিঠিও দেয়া হয়নি।

এ ব্যাপারে শরীয়তপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ জিয়াউর রহমানের সাথে আলাপ কালে তিনি বলেন, সরকারী বিধি মোতাবেক ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। ঘর নির্মাণে কোন অনিয়ম করা হচ্ছে না।

Total View: 1015

    আপনার মন্তব্য





সারাদেশ

কক্সবাজার

কিশোরগঞ্জ

কুড়িগ্রাম

কুমিল্লা

কুষ্টিয়া

খাগড়াছড়ি

খুলনা

গাইবান্ধা

গাজীপুর

গোপালগঞ্জ

চট্টগ্রাম

চাঁদপুর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চুয়াডাঙা

জয়পুরহাট

জামালপুর

ঝালকাঠী

ঝিনাইদহ

টাঙ্গাইল

ঠাকুরগাঁও

ঢাকা

দিনাজপুর

নওগাঁ

নড়াইল

নরসিংদী

নাটোর

নারায়ণগঞ্জ

নীলফামারী

নেত্রকোনা

নোয়াখালী

পঞ্চগড়

পটুয়াখালি

পাবনা

পিরোজপুর

ফরিদপুর

ফেনী

বগুড়া

বরগুনা

বরিশাল

বাগেরহাট

বান্দরবান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ভোলা

ময়মনসিংহ

মাগুরা

মাদারীপুর

মানিকগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জ

মেহেরপুর

মৌলভীবাজার

যশোর

রংপুর

রাঙামাটি

রাজবাড়ী

রাজশাহী

লক্ষ্মীপুর

লালমনিরহাট

শরীয়তপুর

শেরপুর

সাতক্ষীরা

সিরাজগঞ্জ

সিলেট

সুনামগঞ্জ

হবিগঞ্জ

Flag Counter