সোমবার,  ২১শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,  ৬ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,  রাত ১:২৩

স্বাধীনতা যুদ্ধে শরীয়তপুরের কয়েকটি কথা

মার্চ ৭, ২০১৮ , ০৮:২৮

জালাল উদ্দিন আহমেদ

সুজলা-সুফলা-শষ্যশ্যামলা আমাদের বাংলাদেশ। এ দেশের এক সময় এমন অবস্থা ছিল তখন কৃষকের গোলা ভরা ধান ছিল, গোয়াল ভরা গরু ছিল, পুকুর ভরা মাছ ছিল। এক কথায় অতুল ঐশ্বর্যে ভরা ছিল এ দেশ। সেই অতুল ঐশ্বর্যের আকর্ষণে আকৃষ্ট হয়েছিল শক, হুন, গ্রীক, পারসিক, পর্তুগীজ, ওলন্দাজ, ফরাসী ও ইংরেজ। লুণ্ঠন করেছিল তারা এদেশের ঐশ্বর্যরাশি। কালের বিবর্তনে একে একে বিদায় নিয়েছে তারা। থাকলো শুধু ইংরেজ। কিন্তু স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালী শেষ পর্যন্ত উদ্বুদ্ধ হল বৃটিশ তাড়িয়ে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনতে। এল ১৯৪৭ সাল। বাধ্য হল ইংরেজ ভারত ছাড়তে। মুক্ত হল ভারতবর্ষ। সৃষ্টি হল দু’টি স্বাধীন রাষ্ট্র ভারত ও পাকিস্তান।

নতুন আশা-আকাংখা নিয়ে শুরু হল আমাদের জীবন। সুখ ও স্বাচ্ছন্দের মধ্য দিয়ে কাটতে লাগল আমাদের দিন। কিন্তু সুখ আমাদের ভাগ্যে বেশি দিন সইল না। এল ১৯৪৮ সাল। ঢাকায় এলেন তথাকথিত পাকিস্তানের গভর্ণর জেনারেল মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্। জন সভায় তিনি ঘোষণা করলেন-উর্দু হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। উপস্থিত জনতার মধ্য থেকে বাংলা মায়ের দামালছেলেরা প্রতিবাদ জানালো-না-না-না। কিন্তু জিন্নাহ্ সাহেব তাদের প্রতিবাদ না মেনে দৃঢ় কণ্ঠে পুণরায় ঘোষণা করলেন-উর্দু উর্দুই হবে পাকিস্তানের রাষ্ট্র ভাষা। এবার বাংলা মায়ের দামালছেলেরা বজ্রকণ্ঠে বলে উঠল-না-না-না-তা হবে না, ভেঙ্গে গেল সভা। শুরু হল বাংলা ভাষা আন্দোলন।

গেল কয়েকটি বছর। পুঞ্জিভূত হল বাঙ্গালীর শোকতাপ। এল রক্তক্ষয়ী ১৯৫২ সাল। ছাত্র জনতা নেমে এল রাস্তায়। শ্লোগান দিল রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই। বাঙ্গালীর এ আন্দোলনকে প্রতিহত করার জন্য শাসকগোষ্ঠি বুলেট চালাল বাঙ্গালীর বুকে। শহীদ হল বাংলা মায়ের দামাল ছেলে রফিক, শফিক, সালাম, বরকত, জব্বার, বরকত ! রক্তে রঞ্জিত হল রাজপথ।

গেল কয়েকটি বছর। এল ১৯৫৮ সাল। আইয়ুব খাঁ জারি করলেন মার্শাল ল’। তিনি এক দশক কাল বাঙ্গালী জাতির ওপর চালালেন স্টিম রোলার। কিন্তু স্বাধীনতাকামী বাঙ্গালী দমবার পাত্র নয়। ভেতরে ভেতরে বাঙ্গালী স্বাধীনতার অনুপ্রেরণা যোগাতে লাগল। এল ১৯৬৯ সাল। আইয়ুব খাঁর বিরুদ্ধে বিষ্ফোরিত হল আন্দোলন। শেষ পর্যন্ত ক্ষমতাশীন আইয়ুব খাঁকে ছাড়তে হল বাংলা। নতুনরূপে এলেন ইয়াহিয়া খাঁ। দিলেন সাধারণ নির্বাচন। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতায় জয়ী হল আওয়ামীলীগ। ঢাকায় এসে তিনি বললেন, পাকিস্তানের ভাবি প্রধান মন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান। চলে গেলেন পিন্ডি। ভুট্টোর সাথে গোপন আতাত করে তিনি আর ক্ষমতা হস্তান্তর করলেন না। আওয়ামী লীগের অসহযোগের ডাকে নিরব থাকতে পারল না তৎকালীন পূর্ব মাদারীপুর, শরিয়তী আন্দোলনের অগ্রনায়ক হাজী শরীয়তুল্লাহ্র নামাঙ্কিত আজকের শরীয়তপুর।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণের প্রেক্ষিতে গঠিত হল প্রতি ইউনিয়নে সংগ্রাম পরিষদ। এল’৭১ এর সেই কালরাত্রি-২৫শে মার্চ। ঘুমন্ত বাঙ্গালীর ওপর পাকসেনারা অতর্কিতে চালাল মর্টাল, মেশিনগান, ষ্টেনগান আর রাইফেলের গুলি। লাখ লাখ বাঙ্গালী শহীদ হল সে রাতে।

২৬শে মার্চ সকাল ৮ টায় পালং অয়্যারলেস অফিসের তৎকালীন কর্মকর্তা আবদুস সালেক খান ঢাকা মগবাজার বেতার কেন্দ্র থেকে উপরোক্ত গধংংধমব পান। তিনি তৎক্ষনাৎ পালং থানার তদানিন্তন দারোগা জনাব জাফর সাহেবের পুত্র মানিককে দিয়ে বিভিন্ন মহলে খবর দিতে বলেন। তখন আবুল কাসেম সি.ও. (ডেভ), আনোয়ার হোসেন এস.ও. জেলা পরিষদ, জাফর দারোগা সাহেব, নূরুল ইসলাম চৌধুরী, মনোজ কুমার অধিকারী, আমি এবং আর কয়েকজন, বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করছিলাম শুকুর এন্ড শাহীন ড্রাগ হাউসে। এমন সময় উক্ত গধংংধমব নিয়ে এলো মানিক। সাথে সাথে আমরা অনুবাদ ও অনুলিপি করে বিভিন্ন জায়গায় পাঠাতে লাগলাম। খবর ছড়িয়ে পড়ার সাথে সাথে পালং বাজারে ভীর হল অসংখ্য লোকের। নেতৃত্বস্থানীয়গণ বসলেন পরামর্শ সভায় পালং ইউনিয়ন কাউন্সিলের দোতলায়। উপস্থিত ছিলেন সেদিন অনেকেই, মনে পড়ছে এইচ.এস. সিরাজউদ্দিন, রথীন্দ্র কান্ত ঘটক চৌধুরী, নূরুল ইসলাম চৌধুরী, আবুল ফজল, জনাব আলী আজম শিকদার, জীবন কৃষ্ণ পাল, ক্ষেত্রনাথ দে, মজিবর রহমান চৌধুরী, আবু জাফর দারোগা, স্নেহের ছাত্র সুলতান মাহমুদ (সীমন) প্রমুখদের কথা।

৩১শে মার্চ বিকেল ৩ টায় তুলাসার হাই স্কুল মাঠে অনুষ্ঠিত হল সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের সভা। সভাপতিত্ব করলেন সর্বদলীয় সংগ্রাম পরিষদের চেয়ারম্যান রথীন্দ্র কান্ত ঘটক চৌধরী। সে কি দৃশ্য ! বেলা ১টা থেকে মিছিল করে আসতে লাগল বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে সংগ্রামী জনতা। হাতে তাদের ঢাল শরকী, দা-রামদা, বন্দুক, লাঠিসোটা ইত্যাদি। সে সভায় লোক হয়েছিল ১০ থেকে ১২ হাজার। বক্তব্য রাখলেন আবুল ফজল, আবদুর রব মুন্সী, আবু জাফর দারোগা, নূরুল ইসলাম চৌধুরী, এইচ.এস. সিরাজউদ্দিন ও রথীন্দ্র কান্ত ঘটক চৌধুরী প্রমুখ বক্তাগণ। সভায় সিদ্ধান্ত হল, তুলাসার স্কুলমাঠে মুক্তিযোদ্ধাদের ট্রেনিং দেয়া হবে। কে দেবে ট্রেনিং ? কার আছে ট্রেনিং ? হ্যাঁ, আছে। পালং-এর আবদুল কাদের মিয়া, প্রাক্তন মিলিটারী, তিনি দেবেন ট্রেনিং। মনে পড়ে সেদিন জাফর দারোগা সকলকে মাঠি স্পর্শ করিয়ে শপথ করিয়েছিলেন এবং বাঁশি বাজিয়ে ট্রেনিং দিয়েছিলেন। আর মনে পড়ে সেদিন ওড়ান হয়েছিল আমাদের জাতীয় পতাকা। এমনিভাবে পূর্বমাদারীপুরের নড়িয়া, গোসাইরহাট, ভেদরগঞ্জ ও জাজিরা থানার সংগ্রামী ও মুক্তিকামী জনতাও গঠন করেছিলেন সংগ্রাম পরিষদ এবং ঝাঁপিয়ে পরেছিলেন মু্িক্ত সংগ্রামে।

এবার শুরু হল ভারতে ট্রেনিং গ্রহণের পালা। ষ্টুয়ার্ড মুবিবের নেতৃত্বে ১০ই এপ্রিল যাত্রা করেন প্রথম ব্যাচ। এতে ছিলেন ডাঃ কাঞ্চন, হারুন কবির, বাবুল, আঃ মান্নান, আলী আজম ফরিদি, ইউনুছ (মিতালী) আর নাম না জানা আরও ৩০/৩৫ জন। ষ্টুয়ার্ড মুজিবের নেতৃত্বে ৩রা মে যাত্রা করেন দ্বিতীয় ব্যাচ। এতে ছিলেন আবুল কাসেম মৃধা, আলী আজম সিকদার, এসকেন্দার, সিরাজ, নূরুল হক (প্রাক্তন এম.পি), সুলতান মাহমুদ (সীমন), চন্দন এবং আরও নাম না জানা ১০/১২ জন। এরই মধ্যে বিভিন্ন সময়ে নানাদলে মুক্তিযোদ্ধাগণ ভারতে ট্রেনিং গ্রহণের জন্য গিয়েছিলেন। এদিকে দেশের অভ্যন্তরে সংগ্রাম পরিষদের সদস্যগণ মুক্তিকামী সহযোগীগণ পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে লাগলেন। অপরদিকে পাক বাহিনীর দোসররা তথাকথিত শান্তি কমিটি গঠন করে স্বাধীনতার বিরোধিতা করতে লাগল। শুরু হল প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ।

এপ্রিল মাসের শেষের দিক এরই মধ্যে ভারত থেকে ট্রেনিং নিয়ে ফিরে এসেছেন কয়েকজন মুক্তিযোদ্ধা। এইচ.এস. সিরাজউদ্দিন ও ষ্টুয়ার্ড মুজিবের নেতৃত্বে আঙ্গারিয়া বাজারে প্রথম আবির্ভাব মুক্তিযোদ্ধাদের। এটা পাক বাহিনীর বিরুদ্ধে কোন সরাসরি আক্রমণ নয়। এটা ছিল পাক বাহিনীর দোসরদের জানিয়ে দেওয়া যে, মুক্তিবাহিনী ট্রেনিং গ্রহণ করে দেশের অভ্যন্তরে প্রবেশ করেছে।

মে মাসের ২১ তারিখ, নড়িয়া থানার ঘড়িসারে শান্তি কমিটির মিটিং চলছে। মুক্তিযোদ্ধাগণ গ্রেনেড চার্জ করেছেন মিটিং এ। আহত হয়েছে কয়েকজন। ২২শে মে মাদারীপুর থেকে পাক মিলিটারী ঘড়িসার বাজারে এসে কয়েকটি ঘর পুড়িয়ে ফেলে। ফেরার পথে আঙ্গারিয়ায় পাক বাহিনীর কুখ্যাত দোসর সোলেমান মাওলানা ও তার সঙ্গীরা পাক মিলিটারীকে আহ্বান করে নিয়ে মধ্যপাড়ায় নিরীহ জনসাধারণের ওপর বেপরোয়া গুলি বর্ষণ করায়। এতে কাশাভোগ ও মধ্যপাড়ার ৩২৫ জন নিহত হয়। ঘর বাড়িতে অগ্নি সংযোগ করে তারা চলে যায় মাদারীপুর। এরপর চলে ব্যাপক লুটতরাজ। সেদিন সেকি দৃশ্য ! আমি ছিলাম তখন ধানুকা তীনু ডাক্তারের বাড়ী। দেখি আশ্রয়ের জন্য লোকজন ছুটে আস্ছে। এখানে আগুন জ্বলেছিল দুইদিন পর্যন্ত। আহত হয়েছিল অনেক। পরের দিন তাদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হল। মনে পড়ে সেদিন ডাঃ এ.আর. চৌধুরী, জনাব নূরুল ইসলাম চৌধুরী ঔষধ দিয়ে, চিকিৎসা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন যথেষ্ট। আবদুস সালেক খান যথেষ্ট পরিশ্রম করেছিলেন। মধ্যপাড়ার মত এত ঘন বসতি পূর্ণ ও সম্পদ শালী গ্রাম খুবই বিরল। বিভিন্ন স্থান থেকে অনেক হিন্দু আশ্রয় নিয়েছিলো এখানে। মধ্যপাড়া আজ মানুষশূন্য।

জুন মাসের ২০ তারিখ, পালং থানার অফিস কক্ষে চলছে শান্তি কমিটির মিটিং। ষ্টুয়ার্ড মুজিব ও আবুল ফজলের নেতৃত্বে রাত অনুমান ৮ টার সময় মুক্তিযোদ্ধাগণ আক্রমণ চালান সেই সভায়। এ আক্রমণে নিহত হয় শান্তি কমিটির সদস্য জয়নাল আবেদীন তালুকদার ও মাওলানা নূরুল ইসলাম এবং আহত হয় বেশ কয়েকজন। ভুলক্রমে জাফর দারোগা ছুরিকাহত হন। তিনি ছুটে গেলেন দক্ষিণদিকে পাঠক বাজারে কাদের মীরের বাড়ী। খবর পেয়ে এলেন আমাদের সহযোগী নীতিভুষণ সাহা ও ডাঃ এ.আর. চৌধুরী। সাথে সাথে তার ক্ষত স্থানে সেলাই করলেন ডাক্তার সাহেব মুক্তিযোদ্ধাগণ হাত করলেন কয়েকটি রাইফেল আর অয়্যারলেস সেট। তারা চলে গেলেন ডোমসারের দিকে।

জুলাই মাস, ভেদরগঞ্জ থানার মুক্তিযোদ্ধাদের সংগে পার্শ্ববর্তী থানার মুক্তিযোদ্ধাগণ যোগ দিয়ে ভেদরগঞ্জ থানার উপর চালান আক্রমণ। মুখোমুখি এ আক্রমণে শহীদ হন অসীম সাহসী মুক্তিযোদ্ধা আক্কাচ। তাঁর স্মরণে এ বাহিনীর নাম রাখা হয় আক্কাচ বাহিনী। জুলাই মাসের মাঝামাঝি পাক মিলিটারী জাজিরা বাজারে ওঠে এবং তেমন কোন ক্ষতি না করে মাদারীপুরে চলে যায়। জুলাই মাসের শেষের দিকে পাক মিলিটারী নড়িয়া বাজারে ওঠে ৭/৮টি ঘরে অগ্নি সংযোগ করে চলে যায়।

আগষ্ট মাস, মুক্তিযোদ্ধাগণ আক্রমণ চালান নড়িয়া থানার ওপর। অল্প সময়ের মধ্যেই নড়িয়া থানা মুক্তিযোদ্ধাদের আয়ত্বে এসে যায়। এ সম্মুখ যুদ্ধে নড়িয়া থানার মেঝো দারোগা, ১ জন কনেষ্টবল ও কয়েকজন রাজাকার নিহত হয়। পরের দিন আসে মিলিটারী লঞ্চযোগে। লাশ নিয়ে মাদারীপুর ফিরছে লঞ্চ। খবর পেয়ে পালং এর মুক্তিযোদ্ধাগণ আবুল কাসেম মৃধার নেতৃত্বে এ্যাম্বুশ করেন রাজগঞ্জের কুদঘরের নিকট। যখন লঞ্চ কুদঘরের নিকট আসে মুক্তিযোদ্ধাগণ ব্রাশ করে লঞ্চের পিছন দিকটার কিছু ক্ষতি সাধন করে।

পরের দিন আবুল কাসেম মৃধার নেতৃত্বে স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধাগণ পালং থানা অপারেশনের দৃঢ় সিদ্ধান্ত নিলেন। মুক্তিযোদ্ধাগণ সবাই প্রস্তুত। এমন সময় আমি আবুল কাসেম মৃধাকে বললাম, এখন আক্রমণ করা যায় না। কারণ আমাদের বিশেষ সহযোগী সালেক ভাই থানার ভেতরে আছেন। গত ২০শে জুনের অপারেশনে অয়্যারলেস সেট মুক্তিযোদ্ধারা নিয়ে যান। ফলে পুনরায় নতুন অয়্যারলেস সেট আর বাইরে না রেখে থানার মধ্যে পুলিশের তত্ত্বাবধানে বসানো হয়েছে। তাই সালেক ভাই আছেন থানার মধ্যে। তাঁকে না বের করে আক্রমন করা যাচ্ছে না। কেন সালেক ভাই বেরিয়ে আসছেন না ? এ প্রশ্ন সকল মুক্তিযোদ্ধার মনে। কিছুটা এগিয়ে গেল আবু তাহের খলিফা ও সামসুল হক সরদার। তারা অপেক্ষা করছে কখন বেরিয়ে আসবেন সালেক ভাই।

কয়েক বারই আবু তাহের ও সামসুল হক থানার দক্ষিণ দিকে গ্রেনেড নিয়ে এগিয়ে যায়। এক পর্যায়ে থানার দক্ষিণ প্রান্তে কাটা তারের বেড়া কেটে পথ করে নিয়েছে তারা। মনে পড়ে আবু তাহেরের সেদিনকার সাহসীকতার কথা ! সালেক ভাই যখন একান্তই আসছেন না তখন সামসুল হক সরদার সালেক ভাইর বাসার কাজের মহিলা আব্দুলের মাকে দিয়ে মিথ্যে খবর পাঠান; “সালেক ভাইর স্ত্রীর পেটে ভীষণ ব্যথা”। হ্যারিকেন হাতে নিয়ে আব্দুলের মা থানার সামনে যেতেই সেন্ট্রি “ইয়া আলী, পাকিস্তান জিন্দাবাদ” বলে চিৎকার করে উঠল। সাথে সাথে সব পুলিশ পজিশনে চলে গেল। আব্দুলের মা চিৎকার করে বলল-“আমি আব্দুলের মা, স্যারের বাসারতন আইছি।” সালেক ভাই তৎক্ষণাৎ বেড়িয়ে এলেন থানার সামনের চত্ত্বরে, বললেন কি পাগলামি শুরু করছেন আপনারা। ওতো আমার বাসার কাজের লোক। সালেক ভাই বেড়িয়ে এলেন থানা থেকে। ক্লাবের সামনে এসেই দেখলেন আমাদের। সব শুনলেন। তিনি সেদিন আক্রমণে আপত্তি জানালেন।

গতরাত্রে মুক্তিযোদ্ধাগণ আক্রমন চালিয়ে নড়িয়া থানা তাদের আয়ত্বে নিয়েছেন, সেহেতু আজ শেষরাত্রের দিকে মাদারীপুর থেকে মিলিটারী আসার খুবই সম্ভাবনা এবং এই অল্প সময়ের মধ্যে থানা বাহিনীকে যদি পরাস্ত না করা যায়!

আগষ্ট মাসের শেষের দিক ভেদরগঞ্জ থানা আক্রমন করলেন শরীয়তপুরের মুক্তিযোদ্ধাগণ। এটা সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী আক্রমণ। প্রায় ৪৮ ঘন্টা চলেছিল এ আক্রমণ। সরদার মহিউদ্দিন ও লালু সরদারের পুত্র (নাম জানা নেই) শহীদ হয়। শত্রুপক্ষের বেশ কয়েকজন নিহত হয়। অবশেষে ভেদরগঞ্জ থানাও আসে মুক্তিযোদ্ধাদের অধিকারে।

সেপ্টেম্বর মাসের ২১ তারিখ, সালেক ভাই খবর পেয়ে চলে গেলেন বিঝারি। বলে গেলেন আজ পালং থানা এটাক হতে পারে, লক্ষ্য রাখবেন। অপেক্ষা করতে লাগলাম হেড স্যারের বাসায়। রাত ১২টা, ১টা, ২টা, ৩টা তাও আসছে না। অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম। তবে কি আজ কাজ হবে না ! রাত ৩টা বেজে কয়েক মিনিট, হঠাৎ দরজার কড়া নারার শব্দ ! উঠে বসলাম। কে ? উত্তর এলো-রেডি, দরজা খুলুন। বেড়িয়ে এলাম। দেখলাম সকলের হাতে অস্ত্র, পরনে হাফপ্যান্ট, কারো লুঙ্গি, হাতে বাঁধা সাদা কাপড়ের ব্যাচ। কে একজন বললেন, ইনাকে ব্যাচ পরিয়ে দেন। সুবেদার জয়নাল আবেদীন বললেন, দরকার হবে না, ইনি থাকবেন আমার সাথে। তিনটি দলে ভাগ হলেন মুক্তিযোদ্ধাগণ; মর্টারগ্রুপ, এডভান্সগ্রুপ ও ডিফেন্সগ্রুপ। আজকের অপারেশনের সর্বাধিনায়ক সুবেদার জয়নাল আবেদীন। ডিফেন্স দলে নেতৃত্ব দিলেন মিতালী, পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন কাদের মাষ্টার। অয়্যারলেস অফিসের নিকটে এডভান্স দলের নেতৃত্ব দিলেন ইদ্রিস মাষ্টার সাহেব। পথ দেখিয়ে পুকুরের পূর্ব পাড়ে। আর মর্টার গ্রুপের নেতৃত্ব দিলেন সুবেদার জয়নাল আবেদীন সাহেব। পথ দেখিয়ে নিয়ে গেলেন সালেক ভাই। জোড়াভবনের সামন দিয়ে থানার পূর্বদিকে রয়ে গেলাম আমি। এ গ্রুপের কাজ চলবে মনোজ কুমার অধিকারীদের দোতলা দালানের ওপর থেকে। আমরা পাঠক বাজার দিয়ে ওঠলাম গিয়ে সেই দালানে। সুবেদার সাহেব বললেন, এখান থেকে আক্রমণ চালান বিপদজ্জনক। তাই নিয়ে গেলাম পূর্বদিক দিয়ে থানার সেই পুকুরের দক্ষিণপূর্ব কোনে। অধিকারীদের দালানের উপর থেকে আক্রমণ চালাতে না পারায় সভাবতই আমাদের অসুবিধা ছিল। যেখানে হেডকোয়াটার করা হয়েছে তার সামনে একটা পুকুর, থানার সামনেই একটা লম্বা খাদ। এতে সরাসরি থানায় ওঠা বিপদজনক আর তখন ভোর হয় হয় অবস্থা এই চিন্তা করে সুবেদার সাহেব সেদিন আক্রমণ বন্ধ রাখার কথা বললেন। তখন দেখেছি পালং থানা কমান্ডার ইদ্রিস মাষ্টার সাহেবের দৃঢ় প্রত্যয়। তিনি বললেন, আজকেই আক্রমণ চলবে। আর তাতে যদি কেউ পিছ পা হয় তবে আমার গুলিতেই শেষ করব তাকে। তখন ইদ্রিস মাষ্টার সাহেব আমাকে পাঠালেন অয়্যারলেস অফিসের নিকটে ডিফেন্স গ্রুপ রেডি কিনা জানতে। হামাগুড়ি দিয়ে জেনে এলাম তাঁরা রেডি। আবার নির্দেশ পেলাম, আবুল কাসেম মৃধা এল.এম.জি নিয়ে রেডি কিনা। আবার হামাগুড়ি দিয়ে গেলাম। ফেরাম পথে অর্ধেক আসতেই শুনি গুলির আওয়াজ। নেমে পড়লাম রাস্তার পাশে। ঠিক ঐ সময় কানে আসে ফজরের আজানের ধ্বনি। নামাজের জন্য গোলাগুলি বন্ধ থাকল দশ মিনিট। হর্ণ দিয়ে বলা হল পুলিশ বাহিনীকে আত্মসমর্পন করতে। না, কোন ফল হল না। পূনরায় আরম্ভ হল গোলাগুলি। মুক্তিযোদ্ধাগণ এগিয়ে যেতে লাগলেন সামনের দিকে। আমি তখন রাস্তারপাশ ঘেষে ঘেষে ফিরে আসি হেড কোয়ার্টারে। আবু তাহের এমন একজন সাহসী মুক্তিযোদ্ধা ছিল, সব সময়ই সর্বাগ্রে এগিয়ে যাওয়া তার একটা চেষ্টা। তাই সে এগিয়ে গিয়েছিল অয়্যারলেস অফিসের সামনে। থানা থেকে পুলিশ বাহিনী গুলিছোড়ে তা অয়্যারলেস অফিসের পিলারে লেগে রিবাউন্ড হয়ে আবু তাহেরের পিঠে ঢোকে। ঘটনাস্থলেই সে শহীদ হয়। তার বড় আশা ছিল মেঝো দারোগাকে একটা থাপ্পর দিলেও দিবে। কিন্তু এখানেই তার পরিসমাপ্তি ঘটে। মুক্তিযোদ্ধাগণ এগিয়ে যেতে লাগলেন। আব্দুল মান্নান এগিয়ে গেল সিনেমা হল ও কাউন্সিল অফিসের ফাঁকে। ও.সি-র বাসার লেট্রিন এর ছাদের উপর সকলের অগোচরে একটি বাঙ্কার তৈরী করেছিল। সেখান থেকে গুলি ছোড়লে মান্নানের রানে এসে লাগে এবং ৩/৪ দিন পরে শহীদ হয়। ভোর ৭টায় পালং থানা সম্পূর্ণভাবে মুক্তিযোদ্ধাদের দখলে আসে।

পরের দিন পাক মিলিটারী রাজগঞ্জ থেকে গুলি করতে করতে পালং আসে। এতে চর পালং এর পাটকাটা শ্রমিক গুলিবিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করল। দুই তিন দিন পরে পুনরায় মিলিটারী আসে পালং। এবারে পালং বাজারের ২০/২৫টি ঘরে আগুন দিয়ে পুড়ে ফেলে ব্যাপক ক্ষতি সাধন করল। একমাত্র অধিকারীদের ৭টি ঘর পুড়ে ফেলে। পরে চলে যায় চিকন্দী। সেখানে ৮/১০টি ঘরে অগ্নি সংযোগ করে মাদারীপুর চলে যায়। সেদিন ছিলাম আমি চিকন্দি সালেক ভাইর সাথে।

Total View: 1435

    আপনার মন্তব্য





সারাদেশ

কক্সবাজার

কিশোরগঞ্জ

কুড়িগ্রাম

কুমিল্লা

কুষ্টিয়া

খাগড়াছড়ি

খুলনা

গাইবান্ধা

গাজীপুর

গোপালগঞ্জ

চট্টগ্রাম

চাঁদপুর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চুয়াডাঙা

জয়পুরহাট

জামালপুর

ঝালকাঠী

ঝিনাইদহ

টাঙ্গাইল

ঠাকুরগাঁও

ঢাকা

দিনাজপুর

নওগাঁ

নড়াইল

নরসিংদী

নাটোর

নারায়ণগঞ্জ

নীলফামারী

নেত্রকোনা

নোয়াখালী

পঞ্চগড়

পটুয়াখালি

পাবনা

পিরোজপুর

ফরিদপুর

ফেনী

বগুড়া

বরগুনা

বরিশাল

বাগেরহাট

বান্দরবান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ভোলা

ময়মনসিংহ

মাগুরা

মাদারীপুর

মানিকগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জ

মেহেরপুর

মৌলভীবাজার

যশোর

রংপুর

রাঙামাটি

রাজবাড়ী

রাজশাহী

লক্ষ্মীপুর

লালমনিরহাট

শরীয়তপুর

শেরপুর

সাতক্ষীরা

সিরাজগঞ্জ

সিলেট

সুনামগঞ্জ

হবিগঞ্জ

Flag Counter