মঙ্গলবার,  ২২শে সেপ্টেম্বর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,  ৭ই আশ্বিন, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,  সন্ধ্যা ৭:২১

স্মৃতিতে ভোজেশ্বরের সেকাল এবং একাল, পর্ব-২

জুন ২৯, ২০২০ , ০৮:০২

আবদুস সোবহান
কীর্তিনাশা নদী তীরে গড়ে উঠা ভোজেশ্বর বন্দরটির গোড়া পত্তন কবে, কখন হয়েছিল, তার কোন সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না। বিভিন্ন সুত্র থেকে জানা যায়, ভোজেশ্বর বন্দরটির বয়স আনুমানিক দেড় শতাধিক বছর হবে। এমনটিই ধারণা করছেন বিশেষজ্ঞ মহল।

তবে, জপসা নিবাসী ফরিদপুরের ইতিহাস খ্যাত আনন্দ নাথ রায়ের মতে, পদ্মায় রাজা রাজবল্লভের রাজপ্রসাদ বিলীন হওয়ার পরে রাজা রাজবল্লভ সেন ভোজেশ্বর বন্দরের পত্তন করেন। রাজা রাজ বল্লভের ভাই রাধাবল্লভ সেন পালং বন্দর পত্তন করেন। তিনি ঢাকার দেওয়ান এবং নবাবের টাকশাল ছিলেন।

বাজারের নামকরণ নিয়ে রয়েছে মিশ্র প্রতিক্রিয়া। কেউ বলেন, ভোজেশ্বর শহর; কেউবা অন্য কিছু। তবে, ভোজেশ্বরের মানুষ যে ভোজন রসিক এটা সর্বজনবিদিত। ঘি, মাখন, ছানা, মিষ্টি ভোজেশ্বরের প্রসিদ্ধ জনপ্রিয় খাদ্য।

ভোজেশ্বর বাজারটির পত্তন হয় স্থানীয় দুই জমিদার পরিবার দ্বারা। তারা হচ্ছেন, এগার আনি জমিদার এবং পাঁচ আনি জমিদার। তারাই হচ্ছেন বাজার সৃষ্টির প্রকৃত স্থপতি। এ দুই জমিদারই ছিলেন বাজারের ষোল আনার মালিক।

বৃটিশ সরকার তাঁদের রাজত্ব পাকাপোক্ত ও খাজনা আদায়ের সুবিধার্থে এদেশীয় কিছু ধনিক ব্যবসায়ীর দ্বারা জমিদারী প্রথার প্রচলন করেন। সেই প্রথানুযায়ী ভোজেশ্বরের দুই ধর্নাঢ্য ব্যবসায়ী পাল পরিবারকে কিছু জমি বন্দোবস্থ দিয়ে জমিদারী প্রদান করেন। শর্তানুযায়ী পরিবার দুটো নিজেদের মধ্যে পাঁচ আনা ও এগার আনা হিস্যা বন্টন করে সমুদয় রাজস্ব আদায় করতেন। ভোজেশ্বর বাজারের খাজনাও এ হিস্যানুযায়ী পরিচালিত হতো।

ভোজেশ্বরের এ জমিদার পরিবার দুটো ছিল মুলতঃ ব্যবসায়ী শ্রেণীভুক্ত। পাঁচ আনী জমিদারদের ছিল জ্বালানী তেলের ব্যবসা। ভোজেশ্বরে তিনি ছিলেন বার্মা শেল কোম্পানীর এজেন্ট। ভোজেশ্বর বাজারের উত্তম সিনেমা হলের জায়গাটিতে তাঁদের জ্বালানী তেলের সংরক্ষনাগার ছিল। এখন অবশ্য হলটির কোন অস্তিস্থ টিকে নেই।

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের সময় জ্বালানী তেলের দুষ্প্রাপ্যতায় পাঁচ আনী জমিদারদের ব্যবসা ফুলে ফেপে উঠে। তাঁরা এলাকায় পরাক্রমশালী হয়ে উঠে এবং এগার আনি জমিদারদের কলকাতামুখী প্রবনতায় বাজারের পুরোপুরি কর্তৃত্ব করায়ত্ব করে নেয়।

পাঁচ আনী পাল জমিদারদের জ্বালানী তেলের ব্যবসা ঝালকাঠি ও চাঁদপুরেও বিস্তৃত ছিল। এখনও চাঁদপুরে পালবাড়ী নামে একটা জায়গা আছে, যেখানে বর্তমানে মেঘনা ও যমুনা তেল কোম্পানীর ডিপো হয়েছে। ঝালকাঠিতেও সন্ধ্যা নদীর তীরে এদের মালিকানাধীন পালবাড়ী নামে একটা জায়গা আছে, যেটা বর্তমানে পদ্মা অয়েল কোম্পানীর ডিপো। এ গুলি সবই এখন সরকারী সম্পত্তি।

ভোজেশ্বরের আরেক জমিদার এগার আনি পালদের ছিল ছড়ানো ছিটানো ব্যবসা। তাছাড়া, তাঁরা ছিল অনেকটা কলকাতামুখী। তাঁদের বাড়ীর এক সন্তান গোষ্ট পাল ছিল ভারত উপমহাদেশের কিংবদন্তী ফুটবল খেলোয়াড়। তিনি কলকাতা মোহন বাগান ক্লাবের নিয়মিত খেলোয়াড় ছিলেন। তিনি স্টপার ব্যাক পজিশনে পায়ে বুট ছাড়া খেলতেন। তাঁকে কাটিয়ে বল নিয়ে গোল পোষ্টে সট করা ছিল প্রায় দুঃসাধ্য। এ কারনে তাঁকে চাইনিজ ওয়াল টাইটেল দেয়া হয়। চাইনিজ ওয়ালের মতোই তিনি ছিলেন দুর্ভেদ্য। কলকাতার ইডেন উদ্যানের প্রবেশ পথে নির্মিত ভোজেশ্বরের সন্তান গোষ্ট পালের আবক্ষ মুর্তি আমাদের ভোজেশ্বরের গৌঁরবগাথাকে স্মরন করিয়ে দেয়। তিনি ১৮৯৬ সনে ভোজেশ্বরে জন্মগ্রহণ করেন। খেলাধুলায় পারদর্শিতার জন্য তিনি ভারত সরকার কর্তৃক ভারতের সেরা পুরষ্কার পদ্মশ্রী পদকে ভূষিত হন। লন্ডনে তাঁর একটি মুর‌্যাল আছে।

১৯৪৭ সালে জিন্নাহর দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত ভাগ হলে এসব জমিদারদের অনেকেই বাড়ীঘর, তাঁদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ত্যাগ করে কলকাতা চলে যান। তবে, কেউ কেউ বাংলাদেশেই থেকে যান। পাঁচ আনী জমিদারদের মধ্যে শ্রীযুক্ত বাবু বিজয় পাল চৌধুরী আমৃত্যু বাংলাদেশে ছিলেন। তিনি ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন সুপুরুষ, গৌরবর্ন, কান্তিময় চেহারা। চোখ দু’টোয় ছিল তীক্ষèতা ও ধুর্ততার চমৎকার মিশেল। চলনে, বলনে আভিজাত্যের ছাপ ছিল সুস্পষ্ট। তবে, তাঁকে দেখলে মনে হতো খাঁচায় বন্দি নখ দন্তহীন এক বৃদ্ধ সিংহ। তাঁর পোষাকী ঠাটবাট ছিল বটে, কিন্তু জমিদারী চলে যাওয়ায় কোন হুংকার ছিল না তার মধ্যে।

এই জমিদারদের জমিদারীকাল আমি দেখিনি, তবে লোক মুখে শুনেছি তাঁদের মহাপ্রতাপ প্রতিপত্তির কথা, বিত্ত বৈভবের কথা। কিন্তু তাঁদের বিত্ত থাকলেও ছিল চিত্তের অভাব। বৃটিশ আমলে তাঁরা ছিল অত্যন্ত মহাপরাক্রমশালী জমিদার। জনহিতার্থে তাঁদের কোন জনহিতকর কাজ ছিল না। প্রজাদের সন্তানদের লেখাপড়ার জন্য তারা গড়ে তুলেননি কোন স্কুল, টোল কিংবা পাঠশালা। ভোজেশ্বরে যথেষ্ট বড় বড় ব্যবসায়ী পরিবার সৃষ্টি হলেও বিদ্যালয়ের অভাবে তেমন একটা শিক্ষিত সমাজের উন্মেষ ঘটেনি। যে ধারার ধারাবাহিকতা আজও কাটিয়ে উঠতে পারেনি ভোজেশ্বর।

আমার ছেলেবেলায় ভোজেশ্বর বাজার সংলগ্ন কোন স্কুল না থাকায় দুরবর্তী প্রাইমারীতে আমরা পড়তে যেতাম। আমি ভর্তি হয়েছিলাম পাঁচক প্রাইমারীতে। এ স্কুলটা গড়ে তুলেছিল পাচক চান্দনীর কিছু দুরদৃষ্টি সম্পন্ন মুসলিম সম্প্রদায়। তাঁদের আজ শ্রদ্ধাবনতঃচিত্তে স্মরন করি।

স্কুলে যাতায়াতের তেমন কোন রাস্তাঘাট ছিল না, বর্ষায় ছিল একগাদা কাঁদাপানি, এমনকি কোথাও কোথাও এক কোমর পানি পর্যন্ত হতো। মনে খুব রাগ হতো ভোজেশ্বরের মানুষ গুলোর উপর; বিশেষ করে চৌধুরী জমিদারদেও উপর। তাঁরা শাসন শোষন করেছে এলাকার দরিদ্র মানুষ গুলোকে; শোষনে শাসনে দরিদ্র হতে দরিদ্রতর হয়েছে নিরিহ প্রজাগুলো অথচ তাদের সন্তানদের জন্য একটা পাঠশালা পর্যন্ত তৈরী করে করেননি তাঁরা।

প্রজাদের নিকট হতে প্রাপ্ত অর্থে পাঁচ আনী জমিদারদের বিত্ত বৈভববের আম্ফালন ঘটলেও তাঁদের চিত্তের শুদ্ধতা বিকশিত হয়নি তেমন ভাবে। তাঁদের যেটার উন্মেষ হয়েছিল সেটা ছিল- ব্যভিচার, যৌনাচার, পাপাচার। তাঁরা আনন্দ ফুর্তিতে মঁজে থাকত সবসময়। কলকাতায় তাদের প্রায় সকলেরই বাড়ী ছিল, যেখানে তারা মাঝে মাঝেই বিনোদনের জন্য যেত।

ভোজেশ্বর হতে কলকাতা যাতায়াতের ব্যবস্থা ছিল সহজ এবং সরাসরি। ভাড়াও ছিল যৎসামান্য। ভোজেশ্বর থেকেই ষ্টিমার যোগে কলকাতা যাওয়া যেত। ষ্টিমারগুলো ছিল অনেক আরামদায়ক। গাজী, লেপচা, অষ্ট্রিস জাহাজগুলো তখন ছিল নুতন এবং ঝকঝকে, তকতকে। ষ্টিমার ঘাট ছিল বর্তমান ভোজেশ্বর পোষ্ট অফিসের লাগোয়া, একটু পশ্চিমে। ষ্টিমারের হুইসেল অনেক দুর থেকে শোনা যেত। ষ্টিমার দেখার জন্য নানা শ্রেণীর মানুষের অনেক ভীড় হতো ঘাটে।

কলকাতায় গিয়ে এসব জমিদার ভোগবিলাসে মত্ত হতেন। কলকাতা হতে বাড়ী ফিরে এরা ভোগবিলাসের অভাব বোধ করায় ভোজেশ্বরে একটা বাইজীঘর তথা রঙ্গশালা নির্মাণ করেন। সেখানে বসে তারা রঙ্গলীলা এবং জুয়ার আড্ডায় দিন পার করতেন। বাইজীদের নৃত্য গীতে ও রং তামাশায় তাদের যৌন ক্ষুধা নিবারিত না হওয়ায় তারা ভোজেশ্বরে গড়ে তোলেন একটি স্থায়ী পতিতালয়। আনন্দ ফুর্তিকে অধিক উপভোগ্য করার জন্য মদ, গাজা, ভাং ইত্যাদিরও দোকান খোলার সুযোগ করে দেন। একটা সমাজকে অধঃপতনে নিতে আর কি লাগে! ওনারা সব করেছেন। যুব সমাজের মধ্যে বিষয়টি সংক্রমনের আশংকায় বাংলাদেশ স্বাধীনতা উত্তর ভোজেশ্বরের সুশীল সমাজ তথা ছাত্র জনতা পতিতালয়টি উচ্ছেদ করে।

বাবু হেমেন্ত পাল চৌধুরী পাঁচ আনী জমিদারের অন্যতম। বর্তমান ভোজেশ্বর তহসিল অফিস যে বিল্ডিংটায় এটাই ছিল ওনার, সরকার অধিগ্রহণের আগমুহুর্ত পর্যন্ত। মাতৃসদন যে বিল্ডিংটায় গড়ে তোলা হয়েছে সেটা ছিল বাবু অনন্ত পাল চৌধুরীর মালিকানাধীন। এখানেই ছিল আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের নিয়মিত সশস্র বাহিনী আক্কাস বাহিনীর ক্যাম্প।

স্বাধীনতা পরবর্তীতে বাবু হেমন্ত পাল চৌধুরী বাংলাদেশে ফিরে আসেন সম্পত্তি পুনরুদ্ধারের আশায়। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। এতোদিনে গঙ্গা, পদ্মা, মেঘনার জল যে অনেক গড়িয়ে গেছে। তাছাড়া বিধাতাও হেসেছেন অলক্ষ্যে। জোর, জুলুম, অত্যাচার, দখল নির্যাতনে গড়া সম্পদ যে আল্লাহ পাক বেশীদিন ভোগ করতে দেন না। এটাই নিয়তির অমোঘ বিধান। যে সুদৃশ্য পুকুড়ের ঘাট ওনারা নির্মাণ করেছিলেন নিজ সন্তান সন্ততি, পরবর্তী প্রজন্মের সুর্যস্নান ও জলকেলীর জন্য; সেখানে আজ সন্তরণ ও জলকেলী করে তাদের প্রজাদের সন্তানেরা; যাদের পুর্বপুরুষদের হাড় ভাংগা খাটুনীর খাজনার অর্থে নির্মিত এই ঘাটলা। পাশেই নির্মিত হয়েছে একটি উচ্চ বিদ্যালয়; যেখানে পড়াশুনা করে আগামী দিনের নুতন স্বপ্নের জাল বুনে স্থানীয় অধিবাসীদের সন্তানেরা।

৭২ সনের মে মাসে আমি যখন কলকাতা যাই, তখন হেমেন্ত বাবুর অনুরোধে তাঁর কলিকাতাস্থ কুমারটুলীর বাসায় গিয়েছিলাম। উনার স্ত্রী ও কন্যার সাথে দেখা হয়েছিল। তাঁদের চোখে মুখে ছিল একরাশ মুগ্ধতা। পুরনো প্রজাদের পরবর্তী প্রজন্মকে দেখতে কার না ভাল লাগে।
চলবে–

লেখকঃ আবদুস সোবহান মাতবর। তিনি শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর ইউনিয়নের সন্তান। তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনে উপ মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি অবসর জীবন যাপন করছেন। তার দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তান রয়েছে।
তার পুত্র ডাঃ নাফিজ ইমতিয়াজ একজন দন্ত বিশেষজ্ঞ এবং এক কন্যা ডাঃ নিশাত তামান্না কনক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। অপর কন্যা নিয়াজ তামান্না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে এখন লন্ডনে অবস্থান করছেন।

Total View: 216

    আপনার মন্তব্য





সারাদেশ

কক্সবাজার

কিশোরগঞ্জ

কুড়িগ্রাম

কুমিল্লা

কুষ্টিয়া

খাগড়াছড়ি

খুলনা

গাইবান্ধা

গাজীপুর

গোপালগঞ্জ

চট্টগ্রাম

চাঁদপুর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চুয়াডাঙা

জয়পুরহাট

জামালপুর

ঝালকাঠী

ঝিনাইদহ

টাঙ্গাইল

ঠাকুরগাঁও

ঢাকা

দিনাজপুর

নওগাঁ

নড়াইল

নরসিংদী

নাটোর

নারায়ণগঞ্জ

নীলফামারী

নেত্রকোনা

নোয়াখালী

পঞ্চগড়

পটুয়াখালি

পাবনা

পিরোজপুর

ফরিদপুর

ফেনী

বগুড়া

বরগুনা

বরিশাল

বাগেরহাট

বান্দরবান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ভোলা

ময়মনসিংহ

মাগুরা

মাদারীপুর

মানিকগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জ

মেহেরপুর

মৌলভীবাজার

যশোর

রংপুর

রাঙামাটি

রাজবাড়ী

রাজশাহী

লক্ষ্মীপুর

লালমনিরহাট

শরীয়তপুর

শেরপুর

সাতক্ষীরা

সিরাজগঞ্জ

সিলেট

সুনামগঞ্জ

হবিগঞ্জ

Flag Counter