বুধবার,  ২৮শে অক্টোবর, ২০২০ খ্রিস্টাব্দ,  ১২ই কার্তিক, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ,  বিকাল ৪:৩৮

স্মৃতিতে ভোজেশ্বরের সেকাল এবং একাল, পর্ব-৪

জুলাই ১, ২০২০ , ২০:১০

আবদুস সোবহান
তখনকার দিনে ভোজেশ্বর বাজারের আকার আকৃতি ও গঠনশৈলীর বাস্তব চিত্র এখনও আমার মনের মধ্যে ভেসে উঠে। বড়ই সুবিন্যস্ত ও নান্দনিকতায় ভরা ছিল তার বাহ্যিক রূপ। কালের স্রোতে ও মানুষের বিবেচনাবোধের অভাবে এ বন্দর নগরীটি ক্রমাগত তার পুরনো ঐতিহ্য হারাতে বসেছে।

আমর শৈশব, কৈশোরে দেখেছি, কাপুরিয়া পট্টি, ধানাপট্টি, দুধ পট্টি, মনোহরি পট্টি, কুমারপট্টি, কামার পট্টি, মাছ বাজার সবকিছুই ছিল অত্যন্ত পরিকল্পিত এবং সাজানো গোছানো।

তখনকার দিনে প্রতি বৈশাখ মাসের প্রথম দিনে ভোজেশ্বরের পুরো ধানাপট্টি জুড়ে নববর্ষের মেলা বসত। দুর দুরান্ত সহ নানা স্থান থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কামার, কুমার, ছুতার ও ময়রারা নানাবিধ দ্রব্যাদি বিক্রির লক্ষ্যে মেলায় নিয়ে আসত। এখন যেমন বাণিজ্য মেলা হতে মানুষ তাদের সারা বছরের তৈজসপত্র ও গৃহস্থালী পণ্য কিনে নেয়, তদ্রুপ, তখনকার দিনেও নববর্ষের মেলা হতে মানুষ সারা বছরের প্রয়োজনীয় সাংসারিক দ্রব্যাদি কিনে নিত।

মেলায় তৈজসপত্র থেকে শুরু করে নানা ধরনের খেলনাপাতি, নানা রকমের মিষ্টি, আমৃত্তি, জিলাপী, বাতাসা প্রভৃতি প্রচুর পরিমান বিক্রয় হতো। শিশু, কিশোররা নববর্ষের মেলার অপেক্ষায় সারাবছর উন্মুখ হয়ে বসে থাকত। সারা বছরের জমানো পয়সা দিয়ে শিশু কিশোররা নলের বাশি, ঘোড়া, হাতি, মেরা, পুতুল কিনে বাশি বাজাতে বাজাতে বাড়ী ফিরত। শিশু কিশোরদের বাঁশির প্যা পো শব্দে নববর্ষের আনন্দ ভিন্ন মাত্রা যোগ করত।

নববর্ষ উপলক্ষে মহাজনরা দোকানপাট পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করতেন, সারা বছরের হিসাব নিকাস করতেন। নানা ধরনের রঙ্গিন কার্ড দ্বারা তাঁদের পণ্য ক্রেতাদের নিমন্ত্রণ পত্র পাঠাতেন। হালখাতার মাধ্যমে সকলকে মিষ্টিমুখ করাতেন।

চৈত্র মাসের শেষার্ধে ভোজেশ্বরের এগার আনি পালের বাড়ীর দক্ষিনের বিস্তির্ণ প্রাঙ্গনে চড়ক পুজা হতো। এ উপলক্ষে এখানেও নব বর্ষের প্রাক-প্রস্ততি হিসাবে চৈত্র সংক্রান্তির মেলা বসত। চড়ক পুজার অন্যতম আকর্ষণ ছিল গাছ ঘুরানো। মধ্যস্থানে একটি গাছ পুঁতে তার চতুর্দিকে বাঁশ বেঁধে চড়কির মতো বানিয়ে তার সাথে কয়েকজন মানুষ ঝুলিয়ে দেয়া হতো। তারপর কয়েকজন সুঠামদেহী মানুষ দড়ি ধরে বিশাল চড়কিটাকে ঘুরাতে থাকত। চড়কির সাথে সাথে প্রচন্ড বেগে মানুষগুলো ঘুরতে থাকত, এ এক অভিনব দৃশ্য। ছেলে বুড়ো সবাই হাততালি দিয়ে তাদেরকে উৎসাহিত করত।

বর্তমানে মশুরা গ্রামে কষ্টি পাথরের যে শিবলিঙ্গটি প্রতিস্থাপন করা হয়েছে, এ শিবলিঙ্গটি তখন এই মেলার স্থানেই ছিল। মেলায় আগত সনাতন ধর্মের অনুসারী নারী পুরুষ ভক্তবৃন্দ উলুধ্বনির মাধ্যমে শিবকে শ্রদ্ধা জানাতো। নিজেদের ও দেশের মঙ্গল কামনা করত।

মেলা প্রাঙ্গন লাগোয়া এগারো আনি জমিদারদের একটি বিশাল পুকুর ছিল, তৎকালীণ পাকিস্থানের স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে ফতেজঙ্গপুর ইউনিয়ন পরিষদের উদ্যোগে প্রতি বছর এই পুকুরে সাঁতার প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠিত হতো। বিভিন্ন খেলাধুলারও আয়োজন করা হতো। তখন ফতেজঙ্গপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ছিলেন মরহুম আবদুল হাই বেপারী। তিনি বাজন পাড়ার মানুষ। পরবর্তীকালে তিনি ভোজেশ্বরে বাড়ী ক্রয় করে চলে আসেন পরিবার পরিজনসহ। অল্পদিনেই তিনি ভোজেশ্বর ইউনিয়নের চেয়ারম্যানের পদ অলংকৃত করেন। তিনি পর পর কয়েকবার চেয়ারম্যান ছিলেন।

জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে ভোজেশ্বর এলাকা ছিল শান্তি-শৃংখলায় বসবাসের এক অনুপম আবাস ভুমি। রাজনৈতিক বিবেচনায় তখন ভোজেশ্বর ছিল নড়িয়া, জাজিরা পালংয়ের কেন্দ্রবিন্দু। নড়িয়া, জাজিরা, পালং নিয়ে গঠিত পাকিস্তান জাতীয় গণপরিষদের সংসদীয় আসনের এম.এল.এ ডাঃ আবুল কাশেম ছিলেন এই ভোজেশ্বরের মানুষ। তিনি চিরদিন বঙ্গবন্ধুর আদর্শের রাজনীতি করে গেছেন। তাঁর চেম্বার ছিল এই বাজারেই। তিনি ছিলেন ইত্তেফাক পত্রিকার স্থানীয় সংবাদদাতা। তাঁরই উদ্যোগে নিয়মিত ভোজেশ্বরে ইত্তেফাক পত্রিকা আসত, তবে একদিন পরে, মফস্বল সংস্করণ হিসাবে; মুল্য ছিল মাত্র চার আনা।

আমার মরহুম পিতা ছিলেন ডাঃ আবুল কাসেমের রাজনৈতিক সহকর্মী এবং ভোজেশ্বর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সেক্রেটারী। তিনিও ইত্তেফাক পত্রিকা নিয়মিত সংগ্রহ করতেন তাঁর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। সেই সুবাদে আমার পত্রিকা পড়ার অভ্যাস ছোটবেলা থেকেই।

ইত্তেফাক পত্রিকার জনপ্রিয় রাজনৈতিক কলাম ছিল মুসাফির। এ কলামটি নিয়মিত পড়তাম। কলামটি লিখতেন, পত্রিকার সম্পাদক তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। এদেশের মানুষকে বাঙ্গালী জাতীয়তাবাদের চেতনায় উদ্বুদ্ধ করতে ইত্তেফাকের ভুমিকা ছিল অপরিসীম। ইত্তেফাকের এই ভুমিকায়, প্রতিহিংসা থেকেই হানাদার পাকিস্তানী বাহিনী ৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় ইত্তেফাক অফিসটি জ্বালিয়ে দেয়।

স্বৈরাচার আইয়ুব খানের শাসনামলে পাকিস্তনি ভয় ভীতি উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ নেতা ডাঃ আবুল কাশেম স্বাধীকার আন্দোলন ও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির লক্ষ্যে অত্র এলাকায় বিভিন্ন সভা সমাবেশ করতেন। বঙ্গবন্ধু তখন আগরতলা ষড়যন্ত্রসহ একাধিক মামলায় জেলবন্দি।

বড় বড় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সে সভাসমুহে যোগদানের লক্ষ্যে ভোজেশ্বর আসতেন। সভাগুলো বেশীর ভাগ হতো পুলিশ ক্যাম্প মাঠে। ভোজেশ্বর এসেই তাঁরা ডাঃ আবুল কাশেমের চেম্বারে বিশ্রাম নিতেন। প্রায়শঃই আগত রাজনীতিবিদদের আপ্যায়নের ব্যবস্থা হতো আমাদের বাড়ীতে। মাঝে মাঝে আমাদের বাড়ীতে মধ্যাহ্ন ভোজের নিমিত্তে নেতাদের নিয়ে আসার জন্যে আমি ঐ চেম্বারে যেতাম। চেম্বারের দুটো জিনিষ আমার মানস পটে আজও গেঁথে আছে। কলকাতা মোহামেডান টিমের খেলোয়াড়দের বাঁধানো একটা ছবি; আরেকটা সুন্দর বনের সুন্দরী, গেওয়াগাছের মধ্যে দন্ডায়মান রয়েল বেঙ্গল টাইগারের একটা ছবি। আজও ছবিগুলো তাঁর উত্তরাধিকারদের নিকট আছে কিনা জানি না; তবে সংগ্রহে থাকলে ভাল লাগবে।

আমাদের বাড়ীতে মধ্যাহ্ন ভোজ শেষে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে সরাসরি তাঁরা জনসভায় যোগ দিতেন। সে সময়কার রাজনীতিবিদগণ ছিল সহজ, সরল, প্রটোকলবিহীন। জনগন যখন তখন তাঁদের সাথে আলাপ আলোচনা করতে পারত। এ প্রসঙ্গে একটা ঘটনা উল্লেখ না করলেই নয়। ডাঃ আবুল কাশেমের চেম্বার হতে মাদারীপুর হতে আগত নেতা শ্রী ফনিভূষন মজুমদারকে নিয়ে আমাদের বাড়ীতে যাচ্ছি, উনি সেখানে খাওয়া দাওয়া করবেন। পথিমধ্যে কাপড় সেলাইরত একজন দরজীকে দেখে তিনি থমকে দাড়ালেন।
বললেন, “মকবুল, তুমি এখানে, কেমন আছো? ইত্যাদি, ইত্যাদি।”
কুশলাদি বিনিময় শেষে কিছুদুর অগ্রসর হতেই তাঁকে আমি জিজ্ঞেস করলাম, “দাদু, মকবুল চাচাকে আপনি কিভাবে চেনেন?”-উনি বললেন, ‘আমরা একসাথে স্বদেশী আন্দোলন করেছি। ওঁ আমার বিপ্লবের সাথী।’
কি নিরহংকার মনোভাব! স্পষ্ট উচ্চারণ! আর আজ! যাক, সে কথায়, নাইবা গেলাম।

তখনকার ভোজেশ্বরের জনসভাগুলোতে প্রচুর জনসমাগম হতো। কোরবান আলী সাহেব, মাদারীপুরের টুন্নু মান্নানসহ বহু নেতা আসতেন। ফরিদপুর, মাদারীপুরের ছাত্র নেতারাও জনসভায় বক্তৃতা করতে আসতেন। তখনকার মানুষ গুলোর মধ্যে কোন ভাগ, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব ছিলনা। সকলের দাবী ছিল এক ও অভিন্ন। দাবী একটাই — বঙ্গবন্ধুর মুক্তি, ও বাংলার স্বাধিকার।
চলবে–

লেখকঃ আবদুস সোবহান মাতবর। তিনি শরীয়তপুর জেলার নড়িয়া উপজেলার ভোজেশ্বর ইউনিয়নের সন্তান। তিনি দীর্ঘদিন বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনে উপ মহাব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বর্তমানে তিনি অবসর জীবন যাপন করছেন। তার দুই কন্যা ও এক পুত্র সন্তান রয়েছে।

তার পুত্র ডাঃ নাফিজ ইমতিয়াজ একজন দন্ত বিশেষজ্ঞ এবং এক কন্যা ডাঃ নিশাত তামান্না কনক স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মেডিকেল অফিসার হিসাবে দায়িত্ব পালন করছেন। অপর কন্যা নিয়াজ তামান্না ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন বিষয়ে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে এখন লন্ডনে অবস্থান করছেন।

Total View: 253

    আপনার মন্তব্য





সারাদেশ

কক্সবাজার

কিশোরগঞ্জ

কুড়িগ্রাম

কুমিল্লা

কুষ্টিয়া

খাগড়াছড়ি

খুলনা

গাইবান্ধা

গাজীপুর

গোপালগঞ্জ

চট্টগ্রাম

চাঁদপুর

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

চুয়াডাঙা

জয়পুরহাট

জামালপুর

ঝালকাঠী

ঝিনাইদহ

টাঙ্গাইল

ঠাকুরগাঁও

ঢাকা

দিনাজপুর

নওগাঁ

নড়াইল

নরসিংদী

নাটোর

নারায়ণগঞ্জ

নীলফামারী

নেত্রকোনা

নোয়াখালী

পঞ্চগড়

পটুয়াখালি

পাবনা

পিরোজপুর

ফরিদপুর

ফেনী

বগুড়া

বরগুনা

বরিশাল

বাগেরহাট

বান্দরবান

ব্রাহ্মণবাড়িয়া

ভোলা

ময়মনসিংহ

মাগুরা

মাদারীপুর

মানিকগঞ্জ

মুন্সিগঞ্জ

মেহেরপুর

মৌলভীবাজার

যশোর

রংপুর

রাঙামাটি

রাজবাড়ী

রাজশাহী

লক্ষ্মীপুর

লালমনিরহাট

শরীয়তপুর

শেরপুর

সাতক্ষীরা

সিরাজগঞ্জ

সিলেট

সুনামগঞ্জ

হবিগঞ্জ

Flag Counter